বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক নতুন শিল্পবিপ্লবের হাতছানি দেখছে। গত চার দশকে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লক্ষ লক্ষ দক্ষ শ্রমিক, বিশেষ করে নারী কর্মীদের নিষ্ঠা ও সূক্ষ্ম হাতের কাজ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টরের এই যুগে কেবল একটি শিল্পের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ। গত চল্লিশ বছরে এদেশের শ্রমিকরা কঠোর শিল্পশৃঙ্খলা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং সূক্ষ্ম কারিগরি দক্ষতা অর্জনে যে সক্ষমতা দেখিয়েছেন, তা আগামী শিল্পবিপ্লবের মূল পুঁজি। আজ যে হাত সুঁই দিয়ে নিখুঁত সেলাই করছে, সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে সেই হাত সার্কিট বোর্ড সংযোজন, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ পরীক্ষা কিংবা সেন্সর নির্মাণের মতো কাজও সমান দক্ষতায় করতে পারবে। বিশ্বের অনেক দেশই এমন রূপান্তরের মাধ্যমে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে প্রবেশ করেছে।
পোশাক শিল্পের বিদ্যমান অবকাঠামোকে আধুনিকায়ন করে ইলেকট্রনিক্স সংযোজন শিল্পের উপযোগী করা সম্ভব। এটি কোনো দিবাস্বপ্ন নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল। প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন, এলইডি, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, সার্কিট বোর্ড ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক উপাদান সংযোজনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে গবেষণা ও উচ্চমূল্য সংযোজিত উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।
এই রূপান্তরের জন্য রাষ্ট্রকে দূরদর্শী ও ধারাবাহিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তি শিল্পের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক-সুবিধা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস, স্বল্পসুদে ঋণ, প্রযুক্তি হস্তান্তরভিত্তিক যৌথ বিনিয়োগ এবং বিশেষায়িত শিল্পপার্কের মতো উদ্যোগগুলোকে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পের বাস্তব সংযোগ স্থাপন জরুরি। পোশাক শিল্পের সাফল্যের ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই আমাদের এই নতুন প্রযুক্তির পথে যাত্রা করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শুধু শ্রম রপ্তানিকারক নয়, বরং একটি দক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীল রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

