গত ৯ আগস্ট প্রথম আলোয় গবেষক নাদিম মাহমুদের একটি মতামত প্রকাশের পর তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ‘প্রথম আলো নিয়ে জামায়াতের এমপির কেন এই বিষোদ্গার’ শীর্ষক ওই লেখার জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ। পরবর্তীতে মারদিয়া মমতাজের সেই প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. নাদিম মাহমুদ। পাঠকদের জন্য এই দুই পক্ষের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি এখানে তুলে ধরা হলো।
মারদিয়া মমতাজ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় অভিযোগ করেন, গোপন বন্দিশালা নিয়ে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে ‘কথিত’ শব্দ ব্যবহারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কেবল তাঁকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী নেতৃত্ব ও রাজনীতিকে বাধাগ্রস্ত করতেই তাঁকে টার্গেট করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একই কথা যখন অনেকে বলছেন, তখন কেবল একজন নারী ও জামায়াতের সংসদ সদস্য হওয়ার কারণেই কি তাঁর ওপর এই আক্রমণ চালানো হচ্ছে? এছাড়া অতীতে তাঁকে নিয়ে করা একটি প্রতিবেদনের শিরোনামে ব্যঙ্গাত্মক শব্দ ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
নাদিম মাহমুদের লেখায় ‘আমরা’ শব্দটি নিয়ে তৈরি করা প্রশ্নের জবাবে মারদিয়া মমতাজ বলেন, লেখক সরাসরি তাঁর কাছে এই শব্দের ব্যাখ্যা না চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে অনুমাননির্ভর কথা লিখেছেন। তিনি কোনো সহিংসতার পক্ষে অবস্থান নেননি দাবি করে বলেন, তাঁর বক্তব্য ছিল রূপক। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, পত্রিকার আসল শক্তি পাঠক, কোনো ইট-কাঠের কার্যালয় নয়। এই প্রসঙ্গে তিনি ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসে ইংল্যান্ডের হিলসবরো স্টেডিয়ামে পদদলিত হয়ে ৯৭ জন লিভারপুল সমর্থক নিহত হওয়ার ঘটনার উদাহরণ টানেন। সে সময় ব্রিটেনের ‘দ্য সান’ পত্রিকা ‘দ্য ট্রুথ’ শিরোনামে মিথ্যা খবর প্রকাশ করে সমর্থকদের দায়ী করেছিল। পরবর্তীতে ২০১২ সালের তদন্তে এটি পুলিশি ধামাচাপা হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং ২০১৬ সালের ইনকোয়েস্ট রায়ে সমর্থকদের সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় লিভারপুলবাসী প্রায় ৩৬ বছর ধরে ‘ডোন্ট বাই দ্য সান’ আন্দোলনের মাধ্যমে পত্রিকাটি বর্জন করে আসছে। এমনকি ২০১৭ সালে লিভারপুল ফুটবল ক্লাব দ্য সান-এর সাংবাদিকদের তাদের স্টেডিয়াম ও অনুশীলন মাঠে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। মারদিয়া মমতাজ বলেন, পাঠক হিসেবে নিজের পছন্দ প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া গণতন্ত্রের অংশ। এছাড়া নাদিম মাহমুদের পূর্ববর্তী কিছু লেখার শিরোনাম, যেমন ৫ ফেব্রুয়ারির ‘“ভারতবিরোধী” জামায়াতের ইশতেহারে কেন ভারতীয় ছবি’ এবং ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, জামায়াতের বিষয়ে কী অবস্থান?’ ইত্যাদির উল্লেখ করে দাবি করেন, লেখক ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে লেখেন।
মারদিয়া মমতাজের এই প্রতিক্রিয়ার জবাবে ড. নাদিম মাহমুদ তাঁর পাল্টা বক্তব্যে বলেন, নারী হিসেবে দুর্বল ভেবে তাঁকে টার্গেট করার দাবিটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তিনি অতীতে জামায়াত আমিরের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নারীর ৫ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা, পেছনের রাজনীতিটা আসলে কী’ শিরোনামে লেখালেখির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তিনি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরোধী। ‘আমরা’ শব্দের ব্যাখ্যা না চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি কোনো সংবাদ প্রতিবেদন ছিল না যে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে হবে; বরং জনপরিসরে দেওয়া বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে মতামত কলামে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মারদিয়া মমতাজ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় ‘আমরা’ শব্দের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
নাদিম মাহমুদ প্রশ্ন তোলেন, একজন সংসদ সদস্য হয়েও মারদিয়া মমতাজ কেন গণমাধ্যম কার্যালয় পোড়ানোর মতো জঘন্য কাজকে লঘু করে দেখে সেখানে লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে গেলেন। মারদিয়া মমতাজের ‘ফকির যেমন ঘা দেখিয়ে টাকা তোলে, সে এই ভাঙা অফিস দেখায়ে আরও একটু মানুষের কাছে যায়’ মন্তব্যটিকে তিনি রূপক নয়, বরং অবজ্ঞা হিসেবে আখ্যা দেন। হিলসবরো ট্র্যাজেডির সঙ্গে প্রথম আলোর ভুলের তুলনাকে অযৌক্তিক দাবি করে তিনি বলেন, দ্য সান বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পিত মিথ্যাচার চালিয়েছিল, অন্যদিকে প্রথম আলোর ভুলটি ছিল একটি সাধারণ শব্দগত ত্রুটি, যা সংশোধনী ও দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে প্রথম আলোর অবস্থান সুস্পষ্ট ছিল এবং তারা বিশেষ ক্রোড়পত্র ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। পরিশেষে, ব্যক্তিগত আক্রোশের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নাদিম মাহমুদ বলেন, জামায়াতের সঙ্গে তাঁর কোনো বৈরিতা নেই এবং তিনি কেবল দলগুলোর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করেন। তিনি মনে করেন, গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

