শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ করে দেওয়া জরুরি

শরীয়তপুর বা ঢাকার শেরেবাংলা নগরের মতো এলাকাগুলোতে সকালের দিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটে তাকালে দেখা যায়, একদল শিশু হাতে চিপসের প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যাদের চোখে লেগে থাকে অসমাপ্ত ঘুমের রেশ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ের চার বছর বয়সী শিশুদের সকাল নয়টার মধ্যে স্কুলে পৌঁছাতে হয়। সাড়ে নয়টা থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত তাদের বিভিন্ন শিখনচর্চা চলে। একই সময়সূচি অনুসরণ করতে হয় পাঁচ বছর বয়সী এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয় দুপুর বারোটা থেকে এবং শেষ হয় বেলা দুটোয়। এই বড় শিশুরা মোটামুটি ঘুম বা কোচিং সেরে আসার সুযোগ পেলেও ছোটদের অবস্থা ভিন্ন।

শিশুদের পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের মিজ রেবেকা স্পেন্সারের গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া প্রি-স্কুল শিশুদের দিনের বেলা ঘুমানোর (ন্যাপ) সুযোগ করে দিলে তা স্মৃতি সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখে। জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে শিশুদের ঘুমের গুরুত্ব বুঝে নার্সারি বা প্রি-স্কুলে ১ থেকে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমের ব্যবস্থা রাখা হয়। বিশেষ করে চীনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০ থেকে ৯০ মিনিট ন্যাপের ব্যবস্থা রয়েছে। গবেষকদের মতে, রাতের ঘুমের ঘাটতি মেটাতে দিনের এই ঘুম শিশুদের শেখানো বিষয় মনে রাখা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

প্রায় ৮৬৪টি বৈজ্ঞানিক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শিশুদের ঘুমের উপকারিতা অনেক। এটি মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায়, নতুন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সাহায্য করে, গভীর ঘুমের সময় গ্রোথ হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে শারীরিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর মেজাজ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে রেখে মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ ও স্ক্রিন-টাইমকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে। বয়সভিত্তিক ঘুমের চাহিদার মধ্যে রয়েছে ৪-১২ মাসের শিশুদের ১২-১৬ ঘণ্টা, ১-২ বছর বয়সীদের ১১-১৪ ঘণ্টা, ৩-৫ বছর বয়সীদের ১০-১৩ ঘণ্টা, ৬-১২ বছর বয়সীদের ৯-১২ ঘণ্টা এবং ১৩-১৮ বছর বয়সীদের ৮-১০ ঘণ্টা।

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে যে দুই শিফটের চর্চা রয়েছে, সেখানে ছোট শিশুদের আগে স্কুলে আসতে হয়। এই নিয়মের পরিবর্তন এনে আগে বড় শিশু (৮ থেকে ১০ বছর) এবং পরে ছোট শিশু (৪ থেকে ৭ বছর) নিয়ে ক্লাস শুরু করলে ছোটরা সকালে আরেকটু ঘুমানোর সুযোগ পেতে পারে। যদিও এতে স্কুলের সিনিয়র শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্যে কিছুটা বিঘ্ন ঘটতে পারে, তবুও শিশুদের স্বার্থে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবা সময়ের দাবি।