পাঁচ বছর আগে তালেবান যখন বিজয়ী হিসেবে কাবুলে প্রবেশ করে, তখন দেশটি ছিল চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ার প্রক্রিয়ায় বোমা হামলায় প্রায় ২০০ আফগান প্রাণ হারিয়েছিলেন। আজকের কাবুল দৃশ্যত অনেক বেশি শান্ত ও পরিচ্ছন্ন। আগের মতো শক্ত দেয়াল, নিরাপত্তাব্যবস্থা বা অস্ত্রধারী বহরের দাপট এখন আর নেই। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে শহরটি। তালেবানের এই পাঁচ বছরের শাসনামলে তাদের অর্জন ও ব্যর্থতাগুলো এখন পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তালেবানের প্রথম শাসনামলের বড় দুর্বলতা ছিল পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা। এবার তারা সেই ভুল করেনি; পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তুলনামূলক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের শেষ সময়ে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের যে বড় হুমকি ছিল, তালেবান তা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে। এখন বড় কোনো বিদ্রোহী চ্যালেঞ্জ নেই এবং আফগানরা এমন অনেক এলাকায় যাতায়াত করতে পারছেন, যা আগে প্রায় অসম্ভব ছিল।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তালেবান কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। বিদেশি সহায়তা হঠাৎ কমে যাওয়ার ধাক্কা সামলে তারা অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির ফলে ব্যবসা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বেড়েছে। বিদেশে থাকা আফগানদের পাঠানো ডলার, কর ও শুল্ক আদায় এবং শরণার্থীদের বিনিয়োগ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। কোশ তেপা খাল, গ্যাস পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্কের মতো বড় প্রকল্পগুলো মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে অনীহার কারণে দুর্নীতি ও জবাবদিহির মতো কাঠামোগত সমস্যা রয়েই গেছে।
তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সামাজিক নীতিতে। গত পাঁচ বছরে নারী ও মেয়েদের অধিকার ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়ায় আফগানিস্তান এখন বিশ্বের অন্যতম চরম লিঙ্গবৈষম্যপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এর ফলে নারী চিকিৎসক ও শিক্ষকদের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান কমিয়ে দিচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও তা আধুনিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। এছাড়া নৈতিক পুলিশিংয়ের নামে নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।
রাজনৈতিকভাবে তালেবান সরকার এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন। দোহা চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী অনেকেই এখন ক্ষমতার বাইরে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তারা এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। সামরিক হুমকি না থাকলেও জনঅসন্তোষ তালেবানের জন্য ভবিষ্যতে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র গড়তে চায়, সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা।
এর প্রায় ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর তালেবানের প্রথম সরকারের পতন হয়েছিল।
২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সেনারা তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ছিল।

