প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। একদিকে কর্মসংস্থানের অভাব, অন্যদিকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল না পাওয়ার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ বেকার থাকছেন, আবার বিদেশেও বড় একটি অংশ যাচ্ছেন স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ কর্মী হিসেবে, যা তাদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি বিপুল বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণের সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারীদের প্রায় ২৯ শতাংশই বেকার। অর্থাৎ প্রতি তিনজন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে একজন কর্মহীন। শুধু বেকারত্ব নয়, চাকরি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে তরুণদের। বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, ২৭ শতাংশের বেশি বেকারকে এক থেকে তিন মাস এবং ৮ শতাংশকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ খুঁজতে হয়। পরিস্থিতি আরও কঠিন উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে; ১৭ শতাংশের বেশি স্নাতক দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন, আর ১৫ শতাংশের বেশি এক থেকে দুই বছর চাকরির অপেক্ষায় কাটান।
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার তীব্রতাও আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, বিডিজবস ডটকমে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীর প্রোফাইল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ চাকরিপ্রার্থী সেখানে নতুন চাকরির সন্ধানে প্রবেশ করেন, যা দুই বছর আগের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। বর্তমানে একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি আবেদন করছেন, যেখানে কোভিড মহামারির আগে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার হার বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী জানান, শুধুমাত্র ঋণ সুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় এই তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বিদেশের শ্রমবাজারেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মীর মাত্র ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী। বাকি ৭৪ শতাংশই অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ। ভারত, নেপাল ও ফিলিপাইন নিয়মিত দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে বেশি আয় করলেও, বাংলাদেশ দক্ষ জনবলের অভাবে পিছিয়ে থাকছে।
উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিগত সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও এর সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএনএম) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোতে দুর্বল পরিকল্পনা ও ফলোআপের অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রকল্পে ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ১৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ড্রাইভিংয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়াদের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণ নেওয়াদের মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ কর্মসংস্থান পেয়েছেন। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, কেবল প্রশিক্ষণই যথেষ্ট নয়; প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ, ঋণ সহায়তা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত না করতে পারলে এসব উদ্যোগ সার্টিফিকেটেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

