ভিয়েতনামের সাফল্য থেকে বাংলাদেশের কী শেখার আছে?

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের দ্রুত, সমন্বিত ও শেখার উপযোগী হতে হবে। তা করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু ভিয়েতনামের সাফল্যের গল্প শোনাতে হবে না, তারা বাংলাদেশের নিজস্ব রূপান্তরের গল্পও বলতে পারবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠকে ভিয়েতনামের রপ্তানি বৈচিত্র্যের অসাধারণ সাফল্যের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে। ভিয়েতনাম কী করেছিল, যা বাংলাদেশ করতে পারেনি—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিন দশক আগের একটি তথ্যে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আজ থেকে ৩০ বছর আগে ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম প্রায় সমান অবস্থানে ছিল। উভয় দেশই তখন তিন কোটি ডলারের মতো রপ্তানি করত, যা তাদের মোট রপ্তানির ১ শতাংশের কম ছিল। এরপর দুই দেশ ভিন্ন পথ বেছে নেয়। বর্তমানে ভিয়েতনামের মোট রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ আসে ইলেকট্রনিক খাত থেকে, আর বাংলাদেশ এখনো সেই ১ শতাংশের গণ্ডি পার হতে পারেনি।

ভিয়েতনামের এই সাফল্য কোনো একক নীতি বা মহাপরিকল্পনার ফল নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সচেতন প্রয়াসের সম্মিলিত ফলাফল। ভিয়েতনামে প্রতিটি অগ্রগতি নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা মোকাবিলায় সরকার, কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশলীদের নতুন কিছু শিখতে হয়েছে। অর্থনৈতিক রূপান্তর তাই শুধু নীতি গ্রহণের নয়, ধাপে ধাপে সক্ষমতা অর্জন ও শেখার ইতিহাস। প্রথম শিক্ষাটি দক্ষতা নিয়ে। স্যামসাংয়ের ব্যবহৃত সফটওয়্যারের প্রায় ১০ শতাংশ ভিয়েতনামের তথ্যপ্রযুক্তি প্রকৌশলীরা তৈরি করেন। হ্যানয়ে অবস্থিত স্যামসাংয়ের বৃহত্তম গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রে দেড় হাজারের বেশি উচ্চ দক্ষ ভিয়েতনামি কর্মী কাজ করেন। তবুও ভিয়েতনামের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এখনো তাদের বড় সমস্যা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির চেয়ে কর্মীর শেখার ক্ষমতা ও নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করার সামর্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

দ্বিতীয় শিক্ষাটি উন্মুক্ত ও বিশ্ব সংযুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ে। সফল ইলেকট্রনিকস রপ্তানিকারক হওয়ার অর্থ হলো আন্তর্জাতিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের অংশ হওয়া। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ভিয়েতনাম বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়, যেখানে তাদের বার্ষিক বিনিয়োগ প্রবাহ গড়ে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশে এই হার এখনো ২ শতাংশের নিচে। ভিয়েতনাম ১৯৯৬ সালে আসিয়ানের মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (এএফটিএ), ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি, ২০০৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং ২০১৭ সালে সিপিটিপিপিতে যোগ দেয়। এসব চুক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন মানদণ্ড ও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করেছে, যা তাদের শেখার পরিসর প্রসারিত করেছে।

তৃতীয় শিক্ষাটি বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) নিয়ে। আজ ভিয়েতনামের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে বিদেশি বিনিয়োগপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে। স্যামসাং ১৯৯৬ সালে দেশি বাজারের জন্য রঙিন টেলিভিশন তৈরির উদ্দেশ্যে প্রথম বিনিয়োগ করে। ২০০৯ সালে তারা বাক নিন প্রদেশে ৬৭০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানিমুখী মুঠোফোন কারখানা স্থাপন করে। ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ স্যামসাং সেখানে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এবং ১ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। কোম্পানিটির বিশ্বব্যাপী মুঠোফোন উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ হয় ভিয়েতনামে। একইভাবে ইন্টেল হো চি মিন সিটিতে এক বিলিয়ন ডলারের সেমিকন্ডাক্টর কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। এসব বিনিয়োগ স্থানীয় প্রকৌশলী ও সরবরাহকারীদের জন্য শেখার সুযোগ তৈরি করেছে।

চতুর্থ শিক্ষাটি শিল্প খাতের জন্য উপযোগী জমি সরবরাহ নিয়ে। প্রায় দেড় দশক আগে স্যামসাং বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছিল, কিন্তু আমরা পর্যাপ্ত আয়তনের জমি নিশ্চিত করতে পারিনি। বড় ইলেকট্রনিকস কারখানার জন্য অসংখ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন, যার জন্য বড় জমির প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত জমি দিতে না পারাটা স্যামসাংয়ের বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারিত না হওয়ার একটি বড় কারণ ছিল। ভিয়েতনামের কাছ থেকে শেখার অর্থ তাদের হুবহু অনুকরণ করা নয়, বরং দক্ষতা বৃদ্ধি, উন্মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রায় ৫০ বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ডেউ’-এর সঙ্গে অংশীদারত্ব আমাদের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে একটি নতুন শিল্প-পরিবেশের জন্ম দিয়েছিল। স্যামসাংয়ের ক্ষেত্রেও তেমন সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু আমরা সেই অতিথিকে স্বাগত জানাতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। ইতিহাস বলবে—তারা এসেছিল, কিন্তু আমরা প্রস্তুত ছিলাম না।