সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের সামরিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অঞ্চলটির শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন কৌশলগত সমীকরণ ভারতের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে, তবে বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিটি নতুন মেরুকরণের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এখনই একটি সুস্পষ্ট ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশল গ্রহণের সময় এসেছে। এই রাষ্ট্রনীতির মূল মানদণ্ড হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে না পড়ে, সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান অটুট রাখাই হবে এর লক্ষ্য। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও জাপানের মতো শক্তির বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আগ্রহকে ভয়ের কারণ হিসেবে না দেখে বরং একে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশকে একটি নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করবে। বন্দর, সমুদ্র অর্থনীতি, লজিস্টিকস এবং আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে স্থিতিশীল ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের স্থায়ী জাতীয় প্রয়োজন। আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ বা সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকার। তবে তুরস্ক, চীন বা অন্য যেকোনো দেশ থেকেই সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হোক না কেন, কূটনৈতিকভাবে এই বার্তা পরিষ্কার রাখা জরুরি যে, এসব পদক্ষেপ কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশলের আওতায় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও বেগবান করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে কোনো সামরিক বা কৌশলগত প্রতিযোগিতায় না জড়ানোই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।
দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রকৃত নিরাপত্তা আসবে অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে। তাই মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল কর্মশক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করতে হবে। আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনো পক্ষ বেছে না নিয়ে নিজের পথ নিজেই নির্ধারণ করা। বিচক্ষণ কূটনীতি, শক্তিশালী সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আত্মনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যা কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আবার কারও ওপর নির্ভরশীলও নয়। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই মূল দর্শনের সাথে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশল যুক্ত হলে দেশ তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

