জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এটিই প্রমাণ করেছে যে উন্নয়ন কেবল আয় বা অবকাঠামোর পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। যখন মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সুযোগ, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরে রূপান্তর করা যায় না, তখন উন্নয়নের দৃশ্যমান সাফল্যও কোনো শাসনব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব দিতে পারে না। অর্থনীতিবিদ এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ এই অভ্যুত্থানকে রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।
আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা তরুণরা উন্নয়নের বাইরে ছিল না; বরং তারা ছিল উন্নয়নেরই সন্তান। তারা আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু এই অর্জন তাদের জন্য প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক কণ্ঠ নিশ্চিত করতে পারেনি। এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট কুয়ালালামপুরের অ্যাস্ট্রো আওয়ানির এক সাক্ষাৎকারে তাদের 'ফ্রাস্ট্রেটেড অ্যাচিভার্স' বা 'অর্জন সত্ত্বেও বঞ্চিত প্রজন্ম' হিসেবে অভিহিত করেন।
এই তরুণদের হতাশা নিষ্ক্রিয়তা থেকে আসেনি, বরং পরিবার ও রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া সাফল্যের মানদণ্ড পূরণ করার পরও প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান থেকেই তাদের ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, স্নাতকদের বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আইএলওর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ১৫-২৯ বছর বয়সীদের ২২ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে ছিল। বিবিএসের অন্য একটি হিসাবে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশই এই তালিকার বাইরে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরির কোটা কেবল একটি নিয়োগবিধি ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সুযোগ বণ্টনের একটি বৈষম্যমূলক নীতি। যখন মেধার চেয়ে পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হলো, তখন শিক্ষার্থীরা একে নাগরিক সমতার পরিপন্থী হিসেবে দেখেছে। 'রাজাকারের নাতিপুতি' মন্তব্য এই বিচ্ছেদকে আরও গভীর করে তোলে।
আন্দোলনটি কেবল শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বঞ্চনা, খাদ্য ও বাসস্থানের উচ্চমূল্য, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক হয়রানির ক্ষোভ যখন তরুণদের বৈষম্যবিরোধী ভাষার সঙ্গে যুক্ত হলো, তখনই তা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এটি ছিল উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত প্রান্তিক গোষ্ঠী এবং অর্জনের স্বীকৃতি না পাওয়া শিক্ষিত তরুণদের সম্মিলিত বিদ্রোহ। এম নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, এই দুই অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি জবাবদিহিহীন ক্ষমতাব্যবস্থা। শেষ পর্যন্ত, শেখ হাসিনার সরকার যে উন্নয়নকে তাদের ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিল, সেই উন্নয়নই এমন এক সচেতন প্রজন্ম তৈরি করেছিল যারা শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থারই প্রত্যাখ্যানকারী হয়ে ওঠে।

