বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ও অবিস্মরণীয় নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান তিনি। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীর উপাধি পান। আজ ১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গড়া মা, মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো ও জনপ্রিয়তার শেকড়ে পৌঁছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নানা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সংকটের মুখে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বে ফিনিক্স পাখির মতো ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে দলটি তার গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা বার বার প্রমাণিত হয়েছে।
বিএনপি’র চেয়ারপার্সন এবং দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছর ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদায় জানায় দেশের মানুষ। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রাম, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বেগম খালেদা জিয়া ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেন। বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বের পর দলের হাল ধরেছেন তার জেষ্ঠ্য পুত্র তারেক রহমান। তিনি দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই উৎরাই, নির্যাতন, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন পার করেছেন তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন কাটিয়েও তিনি দলকে সুসংগঠিত রেখে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০ বছর পর আবারও জনগণের বিপুল সমর্থন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আগামীকাল ১৫ আগস্ট তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রথম জন্মদিন শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পর তিনি দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে দিনাজপুরে। পাঁচ বছর বয়সে খালেদা খানম পুতুলকে তার বাবা দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করান। পরবর্তীকালে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন এবং ১৯৬৩ সালে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় পিত্রালয়ে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, বেগম খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। এরশাদ বিএনপির অভ্যন্তরে ভাঙন ধরানোর জন্য একের পর এক প্রচেষ্টা চালান। তখন অনেকটা আকস্মিকভাবেই রাজনীতিতে এলেন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। দলে দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত এবং এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কয়েকবার আটক করে তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অবিস্মরণীয়।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান হন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁর সরকার দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ বেগম খালেদা জিয়ার জেষ্ঠ্যপুত্র তারেক রহমান গ্রেফতার হন। বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীকালে দুদকের আপিলে এ মামলায় উচ্চ আদালত সাজা বাড়িয়ে রায় দেয়। জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলায়ও তাঁকে দণ্ডিত করে সাজা দেওয়া হয়। কারাবন্দী হওয়ার পর তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারা হেফাজতে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা মহামারী সংক্রমণের মুখে তাঁকে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ মুক্তি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পান।

