আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কোনো সংসদ সদস্য যদি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেন, তবে কি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে? জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সম্প্রতি দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে এবং দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিল হবে। তবে এটি সাংবিধানিকভাবে চূড়ান্ত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ বিষয়ে কোনো আইনি সিদ্ধান্ত দেয়নি। ইসি সচিব আখতার আহমেদ বিষয়টিকে একটি ‘রাজনৈতিক প্রশ্ন’ হিসেবে অভিহিত করে মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি দল থেকে পদত্যাগ করেন বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর ভোটদান নয়। তাছাড়া, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের যে বৈঠক হয়, তা সংসদের নিয়মিত অধিবেশন নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ৪ ধারা অনুযায়ী এই ভোট সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হলেও, সংসদ অধিবেশনে না থাকলেও নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে এই বৈঠক ডাকতে পারে। এই বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, স্পিকার নন। ২০ আগস্টের ভোটটিও সংসদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যবর্তী সময়ে একটি পৃথক বৈঠকে অনুষ্ঠিত হবে। এই স্বতন্ত্র সাংবিধানিক কাঠামোর কারণে ৭০ অনুচ্ছেদ এখানে অপ্রযোজ্য হওয়ার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে।
সাংবিধানিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার পাশাপাশি দ্বিতীয় তফসিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটের ব্যবস্থা ছিল। ভোটার শনাক্তকরণের চিহ্ন থাকলে ব্যালট বাতিলের বিধানও ছিল। অর্থাৎ সংবিধান প্রণেতারা দলত্যাগবিরোধী বিধানের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের গোপন পছন্দের স্বাধীনতাও রেখেছিলেন। ১৯৯১ সালের আইনে গোপন ব্যালটের বদলে প্রকাশ্য ভোট চালু করা হয়, যেখানে ব্যালটের কাউন্টারফয়েলে সদস্যের নাম, বিভক্তি নম্বর ও স্বাক্ষর রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। এটি রাজনৈতিক নজরদারি বাড়ালেও ৭০ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক পরিধি বৃদ্ধি করে না।
তবে বিপরীত ব্যাখ্যাটিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ৭০ অনুচ্ছেদে ‘সংসদের কোনো অধিবেশনে’ বা ‘কোনো বিলের ওপর’ কথাটি নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি; বরং ‘সংসদে’ দলের বিপক্ষে ভোটদানের কথা বলা হয়েছে। যেহেতু ভোটটি সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এবং ভোটদাতারা সংসদ সদস্য, তাই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে এই বিধান প্রযোজ্য হতে পারে বলে কিছু সংবিধান বিশেষজ্ঞ মনে করেন। এই বাস্তবতায় বিষয়টি নিয়ে কোনো সরাসরি বিচারিক নজির না থাকায় একটি সাংবিধানিক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে কোনো সদস্য দলের বাইরে ভোট দিলে তাঁর ভোট বাতিল হওয়ার কোনো বিধান নেই। নির্বাচন কমিশন বৈধ ব্যালটটি গণনা করতে বাধ্য। ভোট দেওয়ার পর আসন শূন্য হবে কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আসন শূন্য হওয়া নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে হয়। ফলে চিফ হুইপের ঘোষণার মাধ্যমেই তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আসন শূন্য হয়ে যায় না। আগে সাংবিধানিক প্রশ্নটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও একটি নীতিগত অসংগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপির ৩১ দফার ৬ নম্বর প্রস্তাবে আস্থাভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার সুযোগের কথা বলা হয়েছিল। দলটির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের সংবিধান সংস্কার অংশের ১১ নম্বর দফায়ও এই চার ক্ষেত্র ছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবে শুধুমাত্র অর্থবিল ও আস্থাভোটে দলীয় আনুগত্য বজায় রেখে অন্য বিষয়ে স্বাধীন ভোটের প্রস্তাব ছিল, যেখানে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে ক্ষেত্র বাড়াতে চেয়েছিল। তবে উভয় পক্ষই ৭০ অনুচ্ছেদের পরিধি সংকুচিত করার পক্ষে রাজনৈতিক অঙ্গীকার করেছে। অথচ বর্তমানে সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন করা হলেও বিগত দুটি অধিবেশনে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের কোনো প্রস্তাব আনা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাংবিধানিক অস্পষ্টতা দূর করতে হলে হয় ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে, অথবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালট ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। রাষ্ট্রপতি যেহেতু পুরো রাষ্ট্রের প্রতীক, তাই তাঁর নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের বিবেকভিত্তিক ও গোপন ভোটের ব্যবস্থা থাকাই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিকভাবে সংগত সমাধান।

