সমাজে মানুষের সহিষ্ণুতা আজ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, যা আমাদের এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজন, রাকিব ও পূর্ণিমার মতো নির্মম ঘটনার কথা আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। রাকিবের পায়ুপথে হাওয়া দিয়ে হত্যার ঘটনা বা পূর্ণিমার মতো শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের চিত্র আমাদের বিবেককে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মানুষ কি এত হৃদয়হীন হতে পারে? জুলাই বিপ্লব ও তৎপরবর্তী সময়ে আমরা যে মব কালচার, নির্বিচারে হত্যা, পুলিশ হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানের দৃশ্য দেখেছি, তা কেবল নির্মমই নয়, বরং অমানবিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ।
আজকের সমাজ ব্যবস্থায় অপরাধের চিত্রগুলো ভিডিও করে অনলাইনে ভাইরাল করার হীন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পশুরাও যেন মানুষের এই নিষ্ঠুরতা দেখে লজ্জাবোধ করছে। রাইসাসহ অসংখ্য শিশু কন্যার ধর্ষণের ঘটনা আমাদের অসুস্থ সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। অতীতে রাজন বা নাজিমের মতো শিশুদের হত্যার বিচারের নজির না থাকায় অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের উল্লাস কাজ করে, যা নতুন করে অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজ আজ এক গভীর বিচারহীনতায় নিমজ্জিত।
সামাজিক অস্থিরতা এবং অপরাধ প্রবণতা এখন মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐশীর মতো সন্তানের দ্বারা পিতা-মাতা হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের কতটা অধঃপতন ঘটেছে। আমরা কি সভ্যতার নামে গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি? এসব ঘটনার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব স্পষ্ট। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি এখনই বিবেক জাগ্রত করতে না পারে, তবে মানবিকতার শেষটুকুও ধ্বংস হয়ে যাবে।
মানুষের এই অসহিষ্ণুতার পেছনে রয়েছে পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব। বর্তমানের ভোগবাদী সমাজে অর্থ উপার্জনের অসম প্রতিযোগিতায় আমরা সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। একান্নবর্তী পরিবারের শেকড় হারিয়ে যাওয়ায় সন্তানরা একাকীত্ব ও অবহেলার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। ধর্মীয় অনুশাসন ও শিষ্টাচারের বুনিয়াদি শিক্ষা পরিবার থেকেই পাওয়ার কথা, কিন্তু ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে আমরা তা সুবিধাবাদের সম্পর্কে পরিণত করেছি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও আজ নির্মল বিনোদন বা নৈতিক শিক্ষার অভাব প্রকট। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সাহসী ও মেধাবী মানুষের জীবনদর্শন তুলে ধরা হচ্ছে না। অনলাইন দুনিয়া, গেমস আর চ্যাটিংয়ের নেশায় সন্তানরা চিটিংবাজ হিসেবে গড়ে উঠছে। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা ও মাদকের অবাধ বিস্তার সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সময় এসেছে আলোর পথে ফেরার। বিবেক জাগ্রত না হলে মানবতা বাঁচবে না, তাই এখনই সম্মিলিতভাবে এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

