গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণত নাটকীয় পরিবর্তন পছন্দ করে না, কিন্তু ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় চমক হয়ে এসেছে। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান একটি মুসলিম জোট গঠনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে পর্দার আড়ালে সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। তিনি এমনভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন যেন ইরান যুদ্ধের উভয় পক্ষই তার কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় খুঁজে পায়।
ওয়াশিংটনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে বাধা দেন এবং সৌদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত জুড়ে দেন। এরই মধ্যে সৌদি ও মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো দক্ষিণ ইরাকে ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের ওপর হামলা চালায়, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের আইআরজিসির উপদেষ্টারা। সৌদি গোয়েন্দারা জানতে পেরেছিল, এই মিলিশিয়াগুলো কুয়েত সীমান্তে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সময়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ায় ইয়েমেনের সানাতেও সৌদি বিমান হামলা চালানো হয়।
এই অঞ্চলে এখন মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। ইরান, গাজা ও লেবাননে সাম্প্রতিক যুদ্ধ সৌদি মানসিকতায় বড় প্রভাব ফেলেছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে শিক্ষিত সৌদি বিশ্লেষকরা দেখছেন কীভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইসরায়েলের গণহত্যায় অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছেন, যা তাদের পশ্চিমা শিবিরের প্রতি অনাস্থা তৈরি করেছে। সৌদি শুরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি বলেন, মক্কা চুক্তি এমন এক সংকটের মুহূর্তে এসেছে যখন ট্রাম্পের ওপর থেকে সবাই আস্থা হারিয়েছে। এই চুক্তি পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক মুসলিম দেশ এতে যোগ দেবে।
এই চুক্তিতে প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্যেরই নিজস্ব কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। ড. আলতুওয়াইজরির মতে, এটি ভারতকে সামলাতে পাকিস্তানকে সহায়তা করবে। তুরস্কও মনে করত তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হুমকির মুখে ন্যাটো যথেষ্ট নয়। সৌদি আরব কেবল তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি নয়, তাদের গোয়েন্দা ও যুদ্ধকৌশলগত পরিকল্পনা থেকেও লাভবান হবে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল সুন্নি মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি জোট গঠন করা এবং আমিরাতের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ছিল সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে মক্কা চুক্তি সেই গোপন পরিকল্পনাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার কৌশলগত বিরোধ এই চুক্তির ফলে আরও তীব্র হয়েছে। যদিও গত মাসে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এবং আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদের কোলাকুলির ছবি শেয়ার করে সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা বেশিদিন টেকেনি। মক্কা চুক্তি নিয়ে আমিরাতি বিশ্লেষক আবদুল খালেক আবদুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা এখন ভালো অবস্থায় নেই। সৌদিরা এখন নিশ্চিত যে আমিরাত ইয়েমেন ও সুদানে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করবে এবং মিসরকে সৌদির বিরুদ্ধে উসকে দেবে। পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছালে রিয়াদ আবুধাবিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারে।
ওয়াশিংটনে এই দুটি জোটকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডর সিঙ্গার মনে করেন, আমিরাত-ইসরায়েল জোট তাৎক্ষণিক সুবিধা দিলেও মক্কা চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ইসরায়েলের কাছে আধুনিক অস্ত্র থাকলেও তাদের কোনো আঞ্চলিক বৈধতা নেই। গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে ইসরায়েল নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করলেও সামরিক লক্ষ্য পূরণে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। এমতাবস্থায় আরব বিশ্ব নিরাপত্তার সন্ধানে মক্কা জোটের দিকেই তাকিয়ে থাকবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

