স্বৈরাচারের পরিণতি: ইতিহাসের শিক্ষা ও নির্মম বাস্তবতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ৮ ডিসেম্বর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ ক্ষমতা থেকে পালিয়েছেন। ইতিহাসের পাতায় এমন ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষ এবং ২০২১ সালে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এছাড়া ২০১১ সালে তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট বেনআলি পালিয়েছেন এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। ২০১২ সালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ, ১৯৭৯ সালে ইরানের রেজা শাহ পাহলভি এবং ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনের ফার্ডিনান্ড মার্কোসকেও জনতার আন্দোলনের মুখে চরম অপমান ও শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। এদের অনেকেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়েও পরবর্তীতে স্বৈরাচারী ও জালিম শাসকে পরিণত হয়েছিলেন। ভোটাধিকার হরণ ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে আজীবন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের কারোই শেষ রক্ষা হয়নি।

পৃথিবীতে মানুষের আগমন ও প্রস্থান খালি হাতেই। অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তবুও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে কিছু শাসক সত্যকে হত্যা করেন, আইন অমান্য করেন এবং জনগণের অধিকার হরণ করেন। দম্ভ ও অহংকারে তারা মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন, কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না যে এই পথ তাদের ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। সব হারানোর পর যখন বোধোদয় হয়, তখন আর শোধরানোর সময় থাকে না। ইতিহাসের নিয়ম অনুযায়ী, অন্যায় ও মিথ্যার অনুসারীরা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় এবং ন্যায় ও সত্যপন্থিরাই জয়ী হয়। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জেহেল ও আবু লাহাবের মতো ঐতিহাসিক চরিত্ররা জুলুম-নির্যাতন চালিয়েও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং অভিশপ্ত হয়েছে।

বিজয়ী হওয়ার জন্য অনেকে আইন লঙ্ঘন ও সত্যকে হত্যা করেন, কিন্তু সব বিজয় প্রকৃত বিজয় নয়। কারবালায় ইয়াজিদ এবং পলাশীতে মীরজাফর বিজয়ী মনে হলেও তারা ইতিহাসে চরম ঘৃণিত। পক্ষান্তরে ইমাম হোসেন (রা.) ও সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হয়েও বিশ্বজুড়ে সম্মানিত। প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটি কথা আছে; মানুষের ওপর জুলুম ও অবিচারের প্রায়শ্চিত্ত জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে করতেই হয়। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সমাজের যেকোনো অবস্থানে থাকা ক্ষমতাবান ব্যক্তিরই উচিত জনগণের সেবক হওয়া। বলপ্রয়োগ করে বা ভোটাধিকার হরণ করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে স্বৈরাচারী হওয়ার পরিণতি যে নির্মম ও করুণ, তা ইতিহাসের অমোঘ সত্য হিসেবে সবারই বোঝা প্রয়োজন।