দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সে গুরুতর ও নিরাময়-অযোগ্য রোগে আক্রান্ত নির্দিষ্ট রোগীদের জন্য চিকিৎসাগত সহায়তায় মৃত্যুর সুযোগ রেখে প্রণীত নতুন আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত ১৮ আগস্ট এই আইনে স্বাক্ষর করেন এবং পরদিন ১৯ আগস্ট এটি ফ্রান্সের সরকারি গেজেট ‘জার্নাল অফিসিয়েলে’ প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে ফরাসি আইনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
এই আইনটি ফ্রান্সের জীবনাবসান-সংক্রান্ত নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি চিকিৎসাগত সহায়তায় প্রাণঘাতী ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জীবনাবসানের অনুমতি চাইতে পারবেন। তবে এটি কোনো অবাধ বা সাধারণ মৃত্যুর অধিকার নয়; বরং আইনটিতে রোগের ধরন, শারীরিক কষ্ট, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং ফ্রান্সের সঙ্গে ব্যক্তির নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের সম্পর্কের মতো বেশ কিছু কঠোর শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনের শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারীকে অবশ্যই ১৮ বছর বয়সী ফরাসি নাগরিক অথবা ফ্রান্সে স্থায়ী ও নিয়মিত বাসিন্দা হতে হবে। তাকে এমন গুরুতর ও নিরাময়-অযোগ্য রোগে আক্রান্ত হতে হবে যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং রোগটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রোগের কারণে সৃষ্ট কষ্ট চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে বা চিকিৎসা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের পরও সেই কষ্ট অসহনীয় বিবেচিত হলে তবেই এই সহায়তা পাওয়া যাবে। তবে কেবল মানসিক কষ্টের ভিত্তিতে এই সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া আবেদনকারীকে নিজের ইচ্ছা স্বাধীনভাবে ও সচেতনভাবে প্রকাশের সক্ষমতা থাকতে হবে, যেখানে অন্য কারও চাপ বা প্রভাবের সুযোগ নেই।
আইনে মৃত্যুসহায়তার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। আবেদনকারীকে একজন চিকিৎসকের কাছে নিজের ইচ্ছা জানাতে হবে, যিনি রোগীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা, রোগের প্রকৃতি এবং আইনি শর্তগুলো যাচাই করবেন। প্রক্রিয়া চলাকালে যেকোনো পর্যায়ে রোগী চাইলে তার অনুরোধ প্রত্যাহার করতে পারবেন। আবার চিকিৎসক যদি দেখেন যে শর্ত পূরণ হচ্ছে না বা রোগীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তবে তিনি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারবেন।
সাধারণত প্রাণঘাতী ওষুধ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজেই গ্রহণ করতে হবে, তবে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হলে চিকিৎসক বা নার্স তা প্রয়োগ করতে পারবেন। নতুন আইনে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিবেকগত আপত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে কেউ ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিবেচনায় এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। সেক্ষেত্রে রোগীর জন্য বিকল্প স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদ গত ১৪ আগস্ট আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখে। পরিষদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আইনি সুরক্ষার আওতায় থাকা প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে অভিভাবকের মতামত, ফার্মাসিস্টদের বিবেকগত অধিকার এবং কিছু বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রাঙ্গণে এই প্রক্রিয়া না করার সুযোগ রয়েছে। আইনটি কার্যকর হলেও এর প্রয়োগের জন্য কাউন্সিল অব স্টেটের ডিক্রির মাধ্যমে বিস্তারিত প্রশাসনিক ও চিকিৎসাগত নিয়ম নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, এর আগে ফ্রান্সের জীবনাবসান-সংক্রান্ত আইন মূলত উপশমমূলক চিকিৎসা বা অকার্যকর চিকিৎসা বন্ধের বিধানের ওপর নির্ভর করত। নতুন এই আইন ফ্রান্সকে ইউরোপের সেই দেশগুলোর কাতারে নিয়ে এলো, যেখানে নির্দিষ্ট শর্তের অধীনে চিকিৎসাগত সহায়তায় মৃত্যুর আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ফরাসি সরকার এখন আইনটির প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীর স্বাধীন ইচ্ছা, চিকিৎসকদের দায়িত্ব এবং দুর্বল রোগীদের সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

