ঢাকার বাতাসে সিসা ও ধুলোবালির আধিক্য, খাল-জলাশয়ে পলিথিন বর্জ্যের স্তূপ এবং শিল্প কারখানার কেমিক্যালে নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ার মতো ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। রাজধানীতে শব্দদূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। অথচ পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে দেশে আইন ও আদালত থাকলেও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। পরিবেশের অপরাধীদের বিচারের জন্য দেশে ৩টি পরিবেশ আদালত থাকলেও সেখানে মামলার সংখ্যা খুবই কম।
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার পরিবেশ আদালতে বর্তমানে ৮ হাজার ৩২২টি মামলা বিচারাধীন থাকলেও এর মধ্যে পরিবেশ অপরাধ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা মাত্র ১৮৩টি। আদালত প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬০৮টি মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে ৪৯১টির নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০২০ সালের দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে মাত্র ২টি এবং পরের বছর ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা না থাকায় পরিবেশ আদালতগুলোতে বর্তমানে হত্যা, প্রতারণা, চেক জালিয়াতি ও বিস্ফোরকের মতো অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধের বিচার কাজ চালানো হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে পরিবেশ আপিল আদালতেও। সেখানে বর্তমানে পরিবেশ সংক্রান্ত মাত্র ৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যেখানে অন্য ধরনের মামলার সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। গত বছর আপিল আদালতে নতুন পরিবেশ মামলা এসেছে ৫টি এবং আগের বছর ছিল ৮টি। আদালত সূত্র জানিয়েছে, বিচারাধীন কোনো পরিবেশ মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ দূষণের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিদ্যমান আইনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কঠিন। পরিবেশ আদালত আইন-২০১০ অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন না। প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ জানাতে হয় এবং তাদের তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া মামলা গ্রহণের সুযোগ নেই। এতে প্রশাসনিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণের কারণে সাধারণ মানুষ আইনি লড়াইয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত মামলার চেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অর্থদণ্ড আরোপকেই বেশি গুরুত্ব দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তেমন ভূমিকা রাখছে না।
মামলার তদন্তেও ধীরগতি রয়েছে। ২০১৬ সালে সাভারে পলিথিনসহ আটক রাসেল হোসেনের মামলায় ৫ জন সাক্ষীকে চার বছরেও আদালতে হাজির করা যায়নি। একইভাবে ২০১৮ সালে তুরাগ নদীতে বালু তোলার দায়ে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ২০২১ সালে জমা হলেও সাক্ষীর অভাবে বিচার আটকে আছে। ঢাকার পরিবেশ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মাসুদুর রহমান বাদল জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি মামলা করতে পারলে মামলার সংখ্যা বাড়ত, কিন্তু বর্তমান আইনে সেই সুযোগ নেই। আইনজীবী শফিকুল আলম বলেন, পরিবেশ আদালত বেকার বসে থাকতে পারে না বলেই সেখানে অন্যান্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করতে হচ্ছে।

