বাজেয়াপ্ত শব্দেরা: নজরুলের লেখা ও হরিদাসের নীরব বিদ্রোহ

কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলার একটি ঘরে দুটি জানালা ছিল। একটি দিয়ে হুগলির আর্দ্র হাওয়া আসত, অন্যটি দিয়ে দেখা যেত ধূসর আকাশ। হরিদাস মুখোপাধ্যায়ের টেবিলে থাকত তিনটি জিনিস—সরকারি সিল, নীল পেনসিল আর কালো কালি। তার কাজ ছিল রাজদ্রোহ জাগাতে পারে এমন লেখা চিহ্নিত করা, প্রয়োজনে বাজেয়াপ্ত করা এবং সংবাদপত্র বন্ধের সুপারিশ করা। অফিসের ইংরেজ সুপারিনটেনডেন্ট তাকে শিখিয়েছিলেন যে শব্দেরও অপরাধ থাকে। স্বাধীনতা, শৃঙ্খল, অত্যাচার, রক্ত, সাম্য—এসব শব্দ পাশাপাশি থাকলে লাল দাগ টানতে হতো। বিশেষ করে ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ নামটি দেখলে তাকে সতর্ক থাকতে হতো। প্রথমবার নামটি দেখে হরিদাস হেসেছিল, কিন্তু পরে দেখল কবির জন্য দপ্তরে আলাদা ফাইল খোলা হয়েছে। ফাইলের ভেতর থাকা কবিতাগুলোর ভাষা ছিল অদ্ভুত; কখনো আগুন, কখনো আজান, কখনো শঙ্খধ্বনি, কখনো যুদ্ধের দামামা। হরিদাস নিয়মমতো কয়েকটি বাক্যের পাশে দাগ দিত, শেষে একটি কবিতার পাশে লিখত, ‘প্রকাশযোগ্য নয়’।

হরিদাস পড়তে পড়তে বুঝল, এই মানুষটি কেবল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে লিখছেন না, বরং মানুষের ভেতরের ছোট ছোট কারাগারের বিরুদ্ধেও লিখছেন। জাতের অহংকার, ধর্মের সংকীর্ণতা, কুসংস্কার, শোষণ, নারীকে ছোট করে দেখা, ধনীর সামনে গরিবের নত হয়ে থাকা—এসবের বিরুদ্ধাচরণ করাই ছিল কবির ব্রত। একদিন হরিদাস প্রতিবেদনে লিখল, ‘লেখার থেকে লেখক বিপজ্জনক।’ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন কেন, হরিদাস বলল, ‘কারণ, তিনি মানুষকে ভয় পেতে শেখান না। মানুষের ভেতরের সত্যিকারের সাহসটাকে জাগিয়ে তোলেন।’ সাহেব হেসে উঠলেন, হরিদাসও হাসল, কিন্তু তার হাসি নিজের কাছেই অপরাধের মতো লাগল। কলেজে পড়ার সময় বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ পড়া হরিদাস চাকরিতে ঢোকার পর সাহিত্যকে কেবল ফাইলের স্তূপ হিসেবে দেখত। কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে দপ্তরের অঘোষিত সূত্র—যে কবিতা পাঠকের মেরুদণ্ড সোজা করে তা রাজদ্রোহ—বারবার ভেঙে যেত। কবির ভাষা হরিদাসকে অস্বস্তিতে ফেলত; এক বাক্যে আরবি-ফারসি, পরের বাক্যে সংস্কৃত, তার পাশে লোকজ শব্দ; যেন বাংলা ভাষার সব দরজা-জানালা খুলে তিনি ঝড় ঢুকিয়ে দিচ্ছেন।

‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশের পর ফাইলটি আগুনে গরম হয়ে উঠেছিল। পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হলো, হরিদাস তাতে স্বাক্ষর করেছিল। তবে ২৩ নভেম্বরের ফাইলটি ছিল অন্য রকম। ফাইলটির ওপরে লেখা ছিল ‘যুগবাণী’। একই দিনে কুমিল্লা থেকে কাজী নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হয়েছেন। হরিদাস প্রথমবার বুঝল, একটি কবিতা, একটি বই, একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা—সব একই সুতোয় বাঁধা। সেই ফাইলেও সে স্বাক্ষর করল, সেদিন তার হাত কাঁপেনি, কিন্তু মনের কোথায় যেন রয়ে গেল অপরাধবোধ। কয়েক মাস পর আদালতের জবানবন্দি পড়ে হরিদাস প্রথমবার সরকারি কপির পাশে নিজের জন্য লিখল, ‘পরে আবার পড়ব।’ এরপর সে গোপনে কাগজ জমাতে শুরু করল। টেবিলের নিচে ছোট কাঠের বাক্সে সে নিজের হাতে নকল করা বাক্য, কবিতার শিরোনাম, তারিখ আর নোট রাখতে লাগল।

এক দুপুরে কেরানি নিতাই খবর দিল, নজরুল জেলে অনশন শুরু করেছেন। হরিদাস খবরটি ফাইলে নথিভুক্ত করল, কিন্তু তার ভেতরে এক অদ্ভুত ক্ষুধা তৈরি হলো। সেই রাতে সে প্রথমবার নজরুলের লেখা নিজের ছেলের সামনে পড়ল। ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, কবি কি সত্যিই জেলে?’ হরিদাস বলল, ‘হ্যাঁ।’ ছেলে বলল, ‘তাহলে সরকার কি সব সময় ঠিক?’ প্রশ্নটি সাধারণ হলেও হরিদাসের মনে হলো, কেউ তার সরকারি সিলটি আয়নার সামনে রেখেছে। এরপর থেকে নজরুলের প্রতিটি লেখা পড়ার আগে সে নিজেকে প্রশ্ন করত, ‘আমি কি সরকারের ভাষা পড়ছি, নাকি মানুষের?’ নজরুলের জীবন তাকে সহজ উত্তর দেয়নি। তিনি একই সঙ্গে মসজিদের মিনার, মন্দিরের ঘণ্টা, শ্মশানের ধোঁয়া আর মাঠের কৃষকের ঘামকে বাংলা ভাষার ভেতর এনে বসিয়েছেন। হরিদাস বুঝতে পারল, এই মানুষটিকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ বললে তাঁকে ছোট করা হয়।

একদিন নতুন নির্দেশ এল নজরুলের লেখা দ্রুত পরীক্ষা করার। একটি নতুন কবিতা এল, যাতে বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস। সেখানে হিন্দু-মুসলমান, শ্রমিক-কৃষক, নারী-পুরুষ পাশাপাশি। হরিদাস পাণ্ডুলিপির ওপর কালো কালি তুলল, তারপর নামিয়ে রাখল। বছরের শেষে বদলির আবেদন মঞ্জুর হয়নি। একদিন তার হাতে এল এমন একটি লেখা, যেখানে কোনো ইংরেজের নাম নেই, আছে শুধু এক দরিদ্র মানুষের কথা; যে ক্ষুধার্ত, অথচ তার চেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত তার সম্মানের অধিকার। হরিদাস বুঝল, শাসনের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ কোনো স্লোগান নয়; যখন মানুষ নিজের অপমানকে স্বাভাবিক বলে মানতে অস্বীকার করে, তখনই ক্ষমতার ভেতরে ফাটল ধরে। সে পাণ্ডুলিপিটি নিষিদ্ধ করল না, ফাইলে লিখল, ‘তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিপদের প্রমাণ নেই।’ এটি ছিল হরিদাসের প্রথম মিথ্যা, যা তাকে সত্যের দিকে নিয়ে গেল।

সাহেব যখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হোয়াট ইজ দ্য ভার্ডিক্ট?’, হরিদাস বলল, ‘এটি নিষিদ্ধ করার মতো লেখা।’ সাহেব বললেন, ‘গুড, মার্ক ইট।’ হরিদাস নীল পেনসিল হাতে নিল, কিন্তু দাগ টানল না। সে বলল, ‘স্যার, লেখা কি সত্যিই নিষিদ্ধ করা যায়? কাগজটা পোড়ানো যায়। ছাপাখানা বন্ধ করা যায়। লেখককে জেলে পাঠানো যায়। কিন্তু যেসব প্রশ্ন লেখা গণমানুষের মনে, তা কি মুছে দেওয়া যায়?’ সাহেব বললেন, ‘ইউ আর বিকামিং সেন্টিমেন্টাল, মুখার্জি।’ হরিদাস মাথা নোয়াল। সেই সন্ধ্যায় সে ফাইলের ওপর লিখল, ‘বাজেয়াপ্ত।’ তারপর সরকারি কপি থেকে একটি অতিরিক্ত পৃষ্ঠা সরিয়ে নিজের বাক্সে রাখল। বহু বছর পরে, অবসর জীবনে নাতি হিমাদ্রী পুরোনো বাক্সটি খুঁজে পেল। বৃদ্ধ হরিদাস বলল, ‘একসময় আমার কাজ ছিল মানুষের কণ্ঠ থামানো। পরে বুঝেছিলাম, কণ্ঠ থামানো যায় না। শুধু মানুষকে কিছুদিন চুপ করানো যায়।’ হিমাদ্রী দাদুর বাক্স নিয়ে নিজের ঘরে বসল। বাইরে শহরের শব্দ। মোবাইলের পর্দায় খবরের পর খবর। কোথাও ধর্মের নামে মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে, কোথাও দরিদ্র মানুষের কথা চাপা পড়ে যাচ্ছে। হিমাদ্রী বুঝতে পারে, পুরোনো ফাইলের ওপর লেখা ‘বাজেয়াপ্ত’ শব্দটি বর্তমানের দিকে তাকিয়ে আছে। দাদু বলল, ‘যা সত্য, তাকে পাহারা দিয়ে রাখা যায়; কিন্তু বাঁচিয়ে রাখা যায় না। তাকে মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে হয়।’ পরদিন হিমাদ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে একটি পোস্টার টাঙিয়ে দিল। নিচে কোনো নিষিদ্ধ সিল নেই, শুধু একটি প্রশ্ন, ‘মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে দেখতে আমাদের আর কত যুগ লাগবে?’ সন্ধ্যায় দেয়ালপত্রের সামনে ভিড় জমল। একজন বৃদ্ধ এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর পকেট থেকে পুরোনো একটি নীল পেনসিল বের করে দেয়ালপত্রের পাশে রেখে যায়। বৃদ্ধ নেই। শুধু বৃষ্টিভেজা করিডরে নীল পেনসিলটি পড়ে থাকে। আর বহু দূরে কোনো অদৃশ্য মুদ্রণযন্ত্রের মতো রাতের ভেতর থেকে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ; যে কণ্ঠ একদিন সেন্সরের ডেস্কে বসা মানুষটিকে শিখিয়েছিল স্বাধীনতা বাইরে পাওয়া কোনো বস্তু নয়, বরং তা মানুষের অন্তরে জন্ম নেওয়া এক অস্থির আলো। সেই আলোকে কালো কালি দিয়ে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু নিভিয়ে ফেলা যায় না।