১৯৪৭ সাল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত, যখন ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সিরিল র্যাডক্লিফের সীমারেখা ধরে সেই সময়ে ‘আজাদি’র যে আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, তা কি সত্যিই অর্জিত হয়েছিল? নাকি ব্রিটিশ শাসকের হাত থেকে ক্ষমতা কেবল স্থানীয় অভিজাতদের হাতে স্থানান্তরিত হয়েছিল? ১৯৪৭ সালের উত্তরাধিকার বিচার করতে গেলে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটি এড়ানোর সুযোগ নেই। পতাকা বদলানোই প্রকৃত আজাদি নয়; আজাদি তখনই অর্থবহ হয় যখন জনগণ নিজেদের শাসন করার প্রকৃত ক্ষমতা অর্জন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতিই শোষক বা উপনিবেশবাদীর সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। ১৯৪৬ সালের ব্যর্থ ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানের পর দেশভাগ ত্বরান্বিত হলেও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট থেকে যায়। ব্রিটিশদের প্রণীত আইন, আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বিদ্যমান।
এই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পুলিশ সার্ভিস। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি আজও মূলত ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ পুলিশ আইন। যদিও ইংল্যান্ডে ব্রিটিশদের নিজস্ব পুলিশ ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম উন্নত, কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেই আইনটি জনগণের নিরাপত্তা বা সেবার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি। ব্রিটিশ শাসকরা শাসিত জনগোষ্ঠীকে যেভাবে দেখত, সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১৮৬১ সালের এই আইনে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের সেবক হিসেবে নয়, বরং একটি দমনমূলক ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এর ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী পুলিশের ওপর সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী মহাপরিদর্শকের সাংগঠনিক ক্ষমতা পুলিশ বাহিনীকে নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখে, যা জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দুর্বল ও কেন্দ্রীভূত।
আমাদের পুলিশের বর্তমান কর্তৃত্ববাদী আচরণকে কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; তারা তাদের ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর অধীনেই কাজ করছে। এই একই উত্তরাধিকার আমাদের বিচারব্যবস্থা, সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের গভীরে প্রোথিত। ব্রিটিশ শাসনের পর যুক্তরাষ্ট্র যেমন নিজের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করেছিল, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তেমনটা করতে পারেনি। তারা ওয়েস্টমিনস্টার মডেল গ্রহণ করলেও ঔপনিবেশিক শাসনপদ্ধতির মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করেনি। ফলে একশ্রেণির ‘কালো ইংরেজ’ তৈরি হয়েছে, যারা চেহারায় ভিন্ন হলেও চিন্তা ও শাসনদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ব্রিটিশ মনমানসিকতা বহন করে।
রাষ্ট্রশিল্প বা স্টেটক্রাফট নিয়ে নতুন করে ভাবতে হলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া অপরিহার্য। আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা ব্রিটিশ মডেল অনুসরণ না করে ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রেসিডেনশিয়াল ব্যবস্থা বেছে নিয়েছিলেন। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক আইন ও রাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের ওপর ভর করে টিকে আছে। ফলে শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হলেও এর ভেতরের ঔপনিবেশিক যুক্তি এখনো অটুট রয়ে গেছে, যা প্রকৃত আজাদির পথে অন্তরায়।
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৬আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৭

