মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থেকে এক নারী যাত্রীর মুঠোফোন ছিনতাইয়ের পর অন্তত ৯০ ঘণ্টা পর্যন্ত নম্বরটি সচল ছিল। বারবার কল দিলেও রিং হয়েছে এবং পুলিশও নিশ্চিত করেছে যে ফোনটি শ্রীমঙ্গলেই আছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করতে না পারায় দীর্ঘ সময় পরও ফোনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগী নারী প্রথম আলোর একজন নিজস্ব প্রতিবেদকের স্ত্রী নিশাত জাহান।
সিলেটে তিন দিনের ভ্রমণ শেষে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার উপবন এক্সপ্রেসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন ওই দম্পতি। অনলাইনে টিকিট কাটার কারণে তাঁরা পাশাপাশি আসন পাননি। নিশাত জানালার পাশের একটি আসনে বসেছিলেন এবং তাঁর স্বামীর আসন ছিল বগির শেষ দিকে। রাত আড়াইটার দিকে ট্রেনটি শ্রীমঙ্গল স্টেশনে থামলে পানি কেনার জন্য স্বামীকে ফোন করতে মুঠোফোনটি বাঁ হাতে নেন নিশাত। ঠিক তখনই প্ল্যাটফর্ম থেকে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে এক ব্যক্তি ফোনটি ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে দ্রুত দৌড়ে পালিয়ে যায়।
নিশাতের চিৎকারে বগির অন্য যাত্রীরা জেগে উঠলেও ততক্ষণে ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়। এ সময় ট্রেনে দায়িত্বে থাকা টিকিট পরীক্ষক ও পুলিশ সদস্যদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হলে তাঁরা ছিনতাইকারীকে ধরার কোনো উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো নিশাতকেই অসতর্কতার জন্য নানা কথা শোনাতে থাকেন। পরে তাঁদের শ্রীমঙ্গল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরদিন সকাল সাড়ে আটটার দিকে ট্রেনটি ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছালে ভুক্তভোগীর স্বামী শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরকার আবদুল্লাহ আল মামুনকে ফোন করে বিষয়টি জানান। তিনি নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ওসির হোয়াটসঅ্যাপে ফোনের মডেল, আইএমইআই নম্বর, সিম নম্বর, ফোনের রং, কভারের বর্ণনা ও ছিনতাইয়ের সময় পাঠান। এরপর পরিচিত সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শে রাত নয়টার পর রাজধানীর কদমতলী থানার সামনের একটি দোকান থেকে অনলাইনে জিডি করা হয়। শ্রীমঙ্গল থানা জিডিটি অনুমোদন করে তদন্তের দায়িত্ব দেয় উপপরিদর্শক (এসআই) নাহিদুর রহমানকে। বিষয়টি মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলামকেও জানানো হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা ও ওসি দুজনেই জানান যে ফোনটির অবস্থান শ্রীমঙ্গল এলাকাতেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসআই নাহিদুর রহমানের দাবি, ফোনের ভেতরের সিমটি সক্রিয় থাকলেও সেটি দিয়ে কাউকে কল করা হচ্ছে না বা আসা কলে সাড়া দেওয়া হচ্ছে না বলে সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যাচ্ছে না। তিনি ভুক্তভোগীকে একই নম্বরের ই-সিম নেওয়ার পরামর্শ দেন। অথচ শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে আটটা পর্যন্ত ওই নম্বরে কল দিলে রিং হচ্ছিল। ছিনতাইকারী অন্য সিম ব্যবহার না করলে অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যাবে না বলে জানান এই তদন্ত কর্মকর্তা। সংকেত অনুসরণ করে ফোনের কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম বহনযোগ্য শনাক্তকরণ যন্ত্রের (পোর্টেবল ডিভাইস) বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই নাহিদুর বলেন, এ ধরনের যন্ত্রের বিষয়ে তাঁর জানা নেই এবং তাঁরা এভাবে কাজ করেন না।
জেলা পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাইলে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তির ব্যবহার পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হয়। সরাসরি কোনো সূত্র না থাকলে ঘটনার সময় ওই এলাকার টাওয়ারের আওতায় সক্রিয় থাকা নম্বরগুলো বিশ্লেষণ করে অপরিচিত বা অস্বাভাবিক নম্বর চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এই প্রযুক্তি জেলা পুলিশের হাতে সরাসরি নেই এবং এ জন্য তাঁদের পুলিশ সদর দপ্তরের ওপর নির্ভর করতে হয়। মৌলভীবাজারে পুলিশের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরাও পর্যাপ্ত নয়। বহনযোগ্য শনাক্তকরণ যন্ত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘না, আমাদের নেই। আমরা আসলে সেই সেকেলে যুগে পড়ে আছি। এসব জিনিস ব্যবহারের সুযোগ আমাদের নেই।’ একই ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি সরকার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ডিভাইস না থাকায় তাঁরা লোকেশন পাওয়ার পর ওই এলাকায় ম্যানুয়ালি ও স্থানীয় সূত্রের সহায়তায় পুরোনো অপরাধীদের খোঁজ করেন।
পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুঠোফোন হারানো বা ছিনতাই হলে আইএমইআই ও সিমের তথ্য দিয়ে জিডি করতে হয়। নতুন সিম ব্যবহার করা হলে আইএমইআই ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তথ্য পাওয়া সহজ হয়। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের পল্টন মডেল থানা ২১ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা ১০৫টি মুঠোফোন তাদের প্রকৃত মালিকদের বুঝিয়ে দিয়ে প্রশংসিত হয়। এই ফোনগুলো উদ্ধারে মতিঝিল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুসাইন মুহাম্মাদ ফারাবী ও পল্টন মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ইকবাল হোসেন সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এএসআই ইকবাল হোসেন জানান, জিডির পর তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে থাকা পোর্টেবল সিম ব্যবহার করে হারিয়ে যাওয়া বা ছিনতাই হওয়া মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বর দিয়ে কল লিস্ট, লোকেশন ও এনআইডিসহ যাবতীয় তথ্য বের করে ফোনের কাছাকাছি পৌঁছান এবং তা উদ্ধার করেন।
পুলিশ সদর দপ্তর হারানো বা ছিনতাই হওয়া ফোনের সঠিক হিসাব প্রকাশ না করলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রতি মাসে সারা দেশে গড়ে ১০ হাজারের বেশি মুঠোফোন বেহাত হয়। তবে হয়রানি ও উদ্ধারের অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই থানায় যান না। আবার ছিনতাই বা চুরির ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জিডিতে কেবল ‘হারানো’ উল্লেখ করা হয়। ফোন উদ্ধারে পুলিশের সক্ষমতা সব জায়গায় সমান নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ ২০২৬ সালের জুলাইয়েই ২ হাজার ৭টি ফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। অথচ শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ বলছে, নির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করার প্রযুক্তি তাদের নেই। তবে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সদিচ্ছা থাকলে মুঠোফোনে সিম সচল থাকা অবস্থায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি উদ্ধার করা সম্ভব।
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষা থাকলেও উচ্চপদস্থ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ফোন উদ্ধারে পুলিশের অতি-তৎপরতার নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর এক জেলার পুলিশ সুপারের ফোন ছিনতাই হওয়ার পরদিনই তা উদ্ধার হয়। ২০২২ সালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের ফোন আট দিনে এবং ২০২১ সালে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের ফোন কিছুদিনের মধ্যে উদ্ধার করা হয়। ২০২৬ সালের ৭ মার্চ রাতে মোহাম্মদপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেনের দুটি আইফোন ছিনতাই হওয়ার পর মাত্র ২৫ ঘণ্টার মধ্যে ফোন দুটি উদ্ধার ও দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই বছরের জুনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের স্ত্রীর চুরি হওয়া আইফোন উদ্ধারে নেমে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা একটি বড় চক্রের সন্ধান পায় এবং ২৪টি আইফোনসহ ১৫৭টি ফোন উদ্ধার করে। এই বৈষম্যের কারণে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের উদ্ধার তৎপরতা কি ঘটনার গুরুত্ব নাকি ভুক্তভোগীর পরিচয় ও যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়?

