টাকা দিলেই মিলছে মন্ত্রী ও সাধারণ মানুষের মুঠোফোনের গোপন তথ্য

দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। কে কার সঙ্গে কথা বলছেন, কী বার্তা পাঠাচ্ছেন কিংবা কখন কোথায় অবস্থান করছেন—এমন অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য এখন নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে সহজেই অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। রীতিমতো ওয়েবসাইট খুলে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি হচ্ছে এই গোপন তথ্য। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও মন্ত্রীরাও এই তথ্য ফাঁসের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

সম্প্রতি এক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ৬ সেপ্টেম্বর একজন মন্ত্রীর মুঠোফোন নম্বর পাঠানো হয়েছিল তথ্য বিক্রয়কারী একটি চক্রের কাছে। তাদের দাবি করা টাকা পরিশোধের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই মন্ত্রীর তিন মাসের কল ডিটেইলস রেকর্ড বা সিডিআর পাওয়া যায়। সেই সিডিআরে মন্ত্রী গত তিন মাসে কার কার সঙ্গে কত সময় কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন এবং কথা বলার সময় তিনি ঠিক কোথায় অবস্থান করছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ ছিল। সংগৃহীত এই সিডিআরের সত্যতা যাচাই করতে পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর ওই মন্ত্রীর দপ্তরে যাওয়া হয়। সিডিআর দেখার পর মন্ত্রী নিজের মুঠোফোন বের করে তথ্য মিলিয়ে দেখেন এবং বিস্মিত হয়ে বলেন, এটি কীভাবে সম্ভব! এভাবে চলতে থাকলে তো কেউ নিরাপদ নয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের যেকোনো মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সিডিআর সংগ্রহ করা সম্ভব। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কেবল ওই মন্ত্রীই নন, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার প্রধান এবং সংবাদমাধ্যমের দুজন কর্মীর মুঠোফোন নম্বরের সিডিআরও সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাওয়া তথ্য সম্পূর্ণ সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে।

অনলাইনে মুঠোফোনের এই গোপন তথ্য কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই অবৈধ ব্যবসা চালানো হচ্ছে। নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করলেই মিলছে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), স্মার্ট এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, বায়োমেetric অর্ডার, লোকেশন বা অবস্থান, এসএমএস, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ, পাসপোর্টের তথ্য এবং মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেনের বিবরণী।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব গত ৩১ আগস্ট এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে এমন ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে ৬০০টির বেশি পোস্টের সন্ধান পেয়েছে তারা। প্রথম আলোও গত অক্টোবরে এ ধরনের কিছু তথ্য এবং কয়েকজনের সিডিআর সংগ্রহ করেছিল।

এসব চক্রের কাজের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা গ্রাহকদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে যোগাযোগ রক্ষা করে। একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে দেখা গেছে, সেখানে তিন মাসের সিডিআর পেতে খরচ হয় ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ছয় মাসের সিডিআরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা। প্রতিটি সেবার জন্য সেখানে আলাদা ফি ও নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ রয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একটি সরকারি সংস্থার মহাপরিচালকের নম্বর দিয়ে টাকা পরিশোধের মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে তার সিডিআর পাঠিয়ে দেয় চক্রটি। ৮ সেপ্টেম্বর ওই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিডিআরের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তথ্য ফাঁসের বিষয়টি তিনি জানতেন, তবে এত দ্রুত ও হালনাগাদ তথ্য যে পাওয়া সম্ভব, তা তার ধারণায় ছিল না।

নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি)। এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানান, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এই চক্রকে চিহ্নিত করতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে মিলে বিটিআরসি কাজ করছে।

একই বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি বা ফাঁস হতে দেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিটিআরসির সঙ্গে সমন্বয় করে এই চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সরকার জোরালোভাবে কাজ করছে।

বর্তমানে দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের মোট গ্রাহকসংখ্যা ১৯ কোটির বেশি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের পাঁচ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ৫৬ শতাংশ মুঠোফোন ব্যবহার করেন। গ্রাহকদের কল, এসএমএস, আইএমইআই নম্বর ও ব্যবহৃত মোবাইল টাওয়ারের তথ্য সংরক্ষণ করা অপারেটরদের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই তথ্যভান্ডার ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ দেশের ১২টি সরকারি সংস্থার। তবে সিডিআরে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম বা সিগন্যালের মতো ইন্টারনেটের মাধ্যমে করা যোগাযোগের তথ্য থাকে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মোবাইল অপারেটরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সরাসরি অপারেটরদের তথ্যভান্ডারে প্রবেশ করতে পারেন। এ জন্য অপারেটরদের কাছে আলাদাভাবে কোনো তথ্য চাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে গ্রামীণফোন ও রবি এ বিষয়ে লিখিত জবাবে দাবি করেছে, তারা তথ্যভান্ডারে প্রবেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং আইন অনুযায়ী কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিদেরই সেখানে প্রবেশাধিকার রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কারা কীভাবে এই তথ্য নিয়ে যাচ্ছে তা বের করা সম্ভব, তবে এর জন্য সরকারের জোরালো সদিচ্ছা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৩৬টি সরকারি ও ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। এর আগে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৫ কোটি নাগরিকের এনআইডি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ সে সময় দাবি করেছিলেন, এই তথ্য ফাঁস জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নয়। টিজিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, তথ্য সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই ফাঁসের ঘটনা সম্পর্কে আগে থেকে জানত না এবং এসব ঘটনায় কারও শাস্তির নজিরও নেই।

তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ব্যক্তিগত যোগাযোগ মানুষের একান্ত নিজস্ব গোপনীয় বিষয়। এটি যখন এভাবে হাতের নাগালে চলে যায়, তখন গোপনীয়তার অধিকার পুরোপুরি ক্ষুণ্ন হয়। কোনো অপরাধী চক্র চাইলে এই সিডিআর কিনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির গতিবিধি ট্র্যাক করে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনাকে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অপব্যবহারের স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য যখন বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়, তখন তা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। সরকারের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই ঘটনার তদন্ত করা, জড়িতদের শনাক্ত করা এবং ব্যবস্থার কারিগরি ও কৌশলগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা।