দেশের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026), ০৯: ৫৫

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। গত জুন মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণই ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে খেলাপিযোগ্য অনেক ঋণ কৃত্রিমভাবে নিয়মিত দেখিয়ে গোপন রাখা হয়েছিল, যা এখন সামনে আসছে।

ব্যাংক খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকগুলোতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও লুটপাট চালানো হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সরকারঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়েছেন এবং এর একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে কিস্তি পরিশোধ না করেও ঋণ নিয়মিত দেখানোর যে বিশেষ সুবিধা ছিল, সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন গোপন থাকা সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির মোট ১ লাখ ৮৯ thousand ৬৮৩ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং এই সময়ে বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়। ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত, যাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের ৬২ শতাংশ। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার জানান, গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সময়মতো কিস্তি না দেওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী কিস্তি বকেয়া হলেই ঋণ শ্রেণিকৃত করা হচ্ছে।

তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির ১ লাখ ৯০৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা বা ৭৫ শতাংশই খেলাপি। বিগত সরকারের সময়ে বেক্সিমকো, এস আলম, অ্যানটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থার্মেক্স গ্রুপের ঋণসংক্রান্ত নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি চরম সংকটে পড়ে। শুধু বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপের কাছেই জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ৬২ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ।

চতুর্থ অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের মোট ঋণ ৫৩,৭৩৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ৩৮,০৫৩ কোটি টাকা বা ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিগত সরকারের আমলে ব্যাংকটি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপরে শীর্ষ ১০-এর তালিকায় রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ৩২,১৩৩ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯,৭৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। এই ব্যাংকটিও একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮,৫২০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৩.৩৮ (63.38) শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের হাতে। বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৮,২৭৬ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ সিকদার পরিবারের হাতে চলে যাওয়ার পর থেকেই ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হতে শুরু করে।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে গত দুই বছরে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে নিষ্পত্তি এবং মামলা করাসহ নানা সুবিধা দিলেও খেলাপি ঋণ কমানো যায়নি। বরং গত জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আরও প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এখন এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় যা ব্যাংক খাতকে আরও সংকটে ফেলে। উন্নতি করতে না পারলেও অন্তত 'ডু নো হার্ম' বা ক্ষতি না করার নীতি অনুসরণ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, একই খেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়ায় বাজারে ভুল বার্তা গেছে এবং অযোগ্য ঋণগ্রহীতাদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান রক্ষার অজুহাতে ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে অযোগ্য ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন না করে, যাদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া উচিত।

এরপর সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এক্সিম ব্যাংকে। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৫৩ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭০.৮১ শতাংশ। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংকটি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় এরপর রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৩.৯৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৭৮.১৫ শতাংশ। ব্যাংকটিও একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।