অসময়ে বাজারে পাকা আম, দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছে থাই জাত ‘কাটিমন’

"আম পাকে বৈশাখে"—বাঙালির এই চিরন্তন ধারণা বদলে দিয়েছে থাইল্যান্ডের বারোমাসি আম ‘কাটিমন’। ভাদ্র মাসের শেষেও বাজারে পাকা কাটিমনের সরবরাহ রয়েছে, যা আশ্বিন মাস পর্যন্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষিবিদদের ধারণা, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের বাজারে বছরজুড়েই এই আম পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার সুদৃশ্য ফলের দোকান—সবখানেই ক্রেতাদের নজর কাড়ছে অসময়ের এই আম। আকার ও গুণমানভেদে প্রতি কেজি কাটিমন ১৬০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই রয়েছে।

দেশের আমের বাজারে কাটিমনের আগমন যেন এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে কাটিমনের উৎপাদন প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ। বর্তমানে আমের বাজারে ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে শীর্ষে রয়েছে আম্রপালি (সাড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ মেট্রিক টন)। এরপর যথাক্রমে হিমসাগর ১৫ শতাংশ, বারি ১০ শতাংশ, হাঁড়িভাঙা ৭ শতাংশ, গোবিন্দভোগ ও কাটিমন ৫ শতাংশ করে, ল্যাংড়া সাড়ে ৪ শতাংশ এবং গোপালভোগ ২ শতাংশ বাজার দখল করে আছে। বাকি সাড়ে ১২ শতাংশ অন্যান্য জাতের আম। তবে এই হিসাব দ্রুতই বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার পরামর্শক ও বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী মো. মেহেদী মাসুদ জানান, কাটিমনের উৎপাদন প্রতিবছর প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। বাংলাদেশে এই আমের বাণিজ্যিক চাষের মূল উদ্যোক্তা মেহেদী মাসুদ বর্তমানে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন项目中 কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে গাম্বিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার সময় তিনি দেখেন যে সেখানে বছরে প্রায় ১০ মাস আম উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের ৬০ শতাংশই আসে মে থেকে আগস্ট—এই চার মাসে। তখন থেকেই তিনি দেশে একটি বাণিজ্যিকভাবে সফল বারোমাসি আমের জাত খুঁজছিলেন।

দেশে ফিরে মেহেদী মাসুদ বেশ কয়েকটি বারোমাসি জাত নিয়ে পরীক্ষা চালান। এর মধ্যে ‘বরিশালী বারোমাসি’র আকার ছোট ও ফলন কম হওয়ায় এবং কুমিল্লার ‘নীলুদ্দিন’ ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ‘বারি-১১’ জাতের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বাণিজ্যিক সাফল্য আসেনি। অবশেষে ভিয়েতনামের একটি সুপারশপে চমৎকার দেখতে থাইল্যান্ডের বিশ্বমানের বারোমাসি জাত ‘কাটিমন’ দেখে তিনি আশাবাদী হন। ২০১৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে কাটিমনের দুই হাজার চারা আমদানি করা হয়। ২০১৬ সালে দেশের ৬৪টি জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে ১০টি করে মাতৃগাছ রোপণ করা হয়। চুয়াডাঙ্গার আমচাষি আবুল কাশেম পাঁচ বিঘা জমিতে এই আম চাষ করে প্রথম বড় সাফল্য পান। এরপর সরকারি উদ্যোগে দেশের প্রায় ৫০ হাজার চাষিকে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং গড়ে তোলা হয় প্রায় সাত হাজার বাণিজ্যিক প্রদর্শনী বাগান।

বর্তমানে দেশে প্রায় সাত হাজার একর জমিতে কাটিমনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে নওগাঁয় (৭০০ থেকে ৮০০ একর) এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে (৫০০ একরের বেশি)। কাটিমন চাষ মূলত দুই পদ্ধতিতে করা হয়—গ্রাফটিং ও টপ ওয়ার্কিং। গ্রাফটিং পদ্ধতিতে কলমের চারা রোপণ করলে ছয় মাসেই মুকুল আসে, তবে গাছের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য প্রথম দুই বছর মুকুল ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন। অন্য পদ্ধতিতে বড় গাছের ডাল কেটে কাটিমনের কলম জুড়ে দেওয়া হয়, যাকে টপ ওয়ার্কিং বলে।

কাটিমন আম চাষে লাভের পরিমাণ অন্য যেকোনো ফলের চেয়ে বেশি। দুই বছর বয়সী একটি গ্রাফটিং গাছে বছরে অন্তত দুবার ফলন হয় এবং প্রতিবারে প্রায় ২০ কেজি করে বছরে মোট ৪০ কেজি আম পাওয়া যায়। প্রতি বিঘায় ১০০টি গাছ রোপণ করলে বছরে ফলন হয় প্রায় ৪,০০০ কেজি। প্রতি কেজি ২০০ টাকা দরে বিক্রি হলে বিঘাপ্রতি আয় দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে পাইকারি মূল্য ১২০ টাকা ধরলেও বিঘাপ্রতি নিট লাভ থাকে প্রায় ৫ লাখ টাকা। এই বিপুল আয়ের কারণেই চাষিদের মধ্যে এই আম চাষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে একটি কাটিমন গাছ ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দিতে পারে।

পাকা কাটিমনের গায়ের রং চমৎকার সোনালি হলুদ হয়ে থাকে। পেয়ারার মতো ‘ব্যাগিং’ পদ্ধতিতে চাষ করায় এটি কাঁচা অবস্থাতেও কিছুটা হলদেটে দেখায়। এর গড় ওজন ৩৯৬ গ্রাম এবং সাধারণত তিনটি আমে এক কেজি হয়। কাটিমনের শাঁস সোনালি হলুদ, আঁটি অত্যন্ত পাতলা এবং এর মিষ্টতা ২০ ব্রিকস (যেখানে আম্রপালির মিষ্টতা ২৬ ব্রিকস)। এই আমে জলীয় অংশ কম থাকায় এটি বেশ শক্ত হয়, যার ফলে কোনো রাসায়নিক ছাড়াই গাছ থেকে পাড়ার পর অন্তত ১০ দিন ভালো থাকে। এই বিশেষ গুণের কারণে কাটিমন রপ্তানির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অধিক মিষ্টি ও কম জলীয় অংশের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘হানি ম্যাঙ্গো’ নামেও পরিচিত।

রাজধানীর বাজারগুলোতে এখন কাটিমনের চাহিদা বেশ ভালো। ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কের ফল বিক্রেতা দেলোয়ার ব্যাপারী জানান, তাঁর দোকানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ কেজি কাটিমন বিক্রি হয়। ভালো মানের বড় আমগুলো ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা এবং মাঝারি আকারের আম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ফুটপাত ও ভ্যানে বিক্রি হওয়া তুলনামূলক ছোট আমগুলোর দাম ১৬০ টাকা কেজি। এছাড়া ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে অনেক উদ্যোক্তা সরাসরি বাগান থেকে ক্রেতাদের কাছে কাটিমন পৌঁছে দিচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহনপুরের আমচাষি ও ব্যবসায়ী শাহিন আলম জানান, তিনি প্রতিদিন প্রায় এক ট্রাক কাটিমন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করছেন।

কাটিমনের এই দ্রুত বিস্তার নিয়ে কোনো কোনো মহলে এটি আগ্রাসী প্রজাতি হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হলেও কৃষিবিজ্ঞানী মেহেদী মাসুদ তা নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে, মানুষ সেখানেই ঝুঁকবে। কাটিমনের মতো উন্নত জাতের ইতিবাচক গুণাবলি কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশীয় জাতের সঙ্গে সংকরায়ণ (হাইব্রিডাইজেশন) করে ভবিষ্যতে আরও নতুন ও উন্নত জাত উদ্ভাবন করতে হবে।

ফলে প্রায় ২০১০ সাল পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললেও কোনো জাতই বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি।.আম্রপালির ফলন সাড়ে ছয় থেকে সাত লাখ মেট্রিক টন, অংশীদারত্ব ৩৫ শতাংশ।

২০২৩ সাল থেকে কাটিমন বাজারে উঠতে শুরু করে।