১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভৌগোলিক দুই প্রান্তকে রেল যোগাযোগের একক সুতায় বাঁধতে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। হিমালয়ঘেঁষা উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণ-পূর্বের সমুদ্র শহর কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ লাইনে ট্রেন চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১০৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে পাঁচটি পৃথক প্রকল্পকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই উদ্যোগটি বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই রুটটি চালু হলে নতুন করে সরাসরি ২০টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ দৈনিক প্রায় আড়াইশ ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে, যা দেশের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের শান্তাহার থেকে বগুড়া এবং পূর্বাঞ্চলের টঙ্গী থেকে আখাউড়া, লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। প্রকল্পগুলোর প্রশাসনিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে।
এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা হবে। তিনি এটিকে রেল যোগাযোগের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক মেলবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেন। মন্ত্রী বলেন, আধুনিক ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক জনপদ থেকে শুরু করে দক্ষিণের সমুদ্রতট পর্যন্ত ট্রেনের গতি ও যাত্রীসেবাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আমাদের লক্ষ্য, যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। এই রুটটি দেশের পর্যটন ও অর্থনীতিতে এক নতুন রূপান্তর ঘটাবে
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আগামী সাড়ে চার বছরের মধ্যেই এই রুটের পাঁচটি প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের কাজ চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে দেশের পুরো রেলপথ ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজে রূপান্তর হবে এবং ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে মিটারগেজ ট্রেনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সারা বিশ্বে এখন মিটারগেজ রোলিং সামগ্রী উৎপাদন কমে আসায় ব্রডগেজ ট্রেন চলাচলই আধুনিক সময়ের দাবি।
এই মহাপরিকল্পনার আওতায় চলমান প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের একটি বিবরণ দিয়েছেন প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা। তিনি জানান, চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা এবং সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এছাড়া লাকসাম-চট্টগ্রামে ১৫ হাজার কোটি টাকা, আখাউড়া-টঙ্গীতে ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং শান্তাহার-বগুড়া রেলপথের উন্নয়নে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল একাকার হয়ে যাবে এবং মালবাহী বা কনটেইনার ট্রেনের চলাচল প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পাবে। রেলওয়ের চলমান আয়ের অর্ধেকের বেশি আসবে এই একটি রুট থেকে।
রেলওয়ে সূত্র জানান, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়াবে। এছাড়া পর্যটকরা একই যাত্রায় পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। এর ফলে পর্যটন খাতের রাজস্ব বহু গুণ বাড়বে। পাশাপাশি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য এবং দক্ষিণাঞ্চলের লবণ ও শুঁটকি দ্রুত ও সস্তায় সারা দেশে পরিবহন করা যাবে। এই নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ১৭ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রেলওয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন বিষয়ে একটি বিশেষ সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, এটি রেলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর মাধ্যমে রেলের দুটি অঞ্চল এক হয়ে যাচ্ছে এবং সরাসরি ট্রেন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় রোলিংস্টক সামগ্রী কেনা হচ্ছে। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম যোগ করেন, পুরো রেলপথ একই ধারায় উন্নত হওয়ায় ট্রেনের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও রেলের আয় বৃদ্ধি পাবে।
সবশেষে রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো রুটে উচ্চগতির ও নিরবচ্ছিন্ন ট্রেন পরিচালনার জন্য রেলওয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এই ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৫-২০ বছরের মধ্যে হয়তো মিটারগেজ ট্রেন চলাচলই বন্ধ হয়ে যাবে। সব রুটেই ব্রডগেজ ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। বিশ্বে মিটারগেজ কোচ, ইঞ্জিন ও রোলিং সামগ্রী নির্মাণ একেবারেই কমে আসছে।
আধুনিক এ সময়ে সারা বিশ্বেই ব্রডগেজ ট্রেন চলাচল করছে। আশা করছি, ৫-৭ বছরের মধ্যেই পুরো রেলপথ ব্রডগেজ/ডুয়েলগেজে রূপান্তর হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী আমরা দ্রুততার সঙ্গে উল্লিখিত ৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করছি। রেলকে লাভবান করাসহ যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ প্রকল্প হবে আশীর্বাদ। সারা দেশ থেকেই কক্সবাজারে ভ্রমণ করবেন সাধারণ যাত্রীরা। বিদেশি পর্যটকরা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রেলে ভ্রমণ করবেন।

