ইরানের সঙ্গে চুক্তির প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের, তবে তেহরানের অনাস্থা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আবারো ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন। তিনি আলোচনার ওপর জোর দিয়ে দাবি করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি আসন্ন। তবে ট্রাম্পের এই ধরনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অবিশ্বাসের পরিবেশ। গত দুই মাসে অন্তত ৩৮ বার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনসভা বা সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেছেন যে, ইরান সমঝোতার জন্য মরিয়া অথবা চুক্তি খুব কাছাকাছি।

ট্রাম্পের এসব দাবির বিপরীতে ইরানি মিডিয়া ও সামরিক কর্মকর্তাদের অবস্থান কঠোর। রোববার ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হামলা থেকে বিরত থাকার জন্য ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছে—এমন দাবি মিথ্যা। সামরিক কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ইরান উচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে। ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাজিদ ইবনে আল রেজা বলেন, শত্রুদের প্রতিটি হুমকিকে তেহরান বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে দেখে এবং তারা চুপ করে থাকবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফোনে কথা বলেছেন। সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, ক্রাউন প্রিন্স সংলাপ ও কূটনৈতিক উপায়ে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তেহরান মনে করে, ট্রাম্প বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন, যার ফলে তার ওপর আস্থা রাখা কঠিন।

এদিকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার খবরে তেহরান পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের তেল শোধনাগার বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সশস্ত্রবাহিনী সতর্ক করেছে যে, এমন হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার চড়া মাশুল দিতে হবে।

ইরানের যুদ্ধকালীন সামরিক কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, মার্কিনিরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পদ ও ভূখণ্ডকে নিজেদের স্বার্থে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। মুসলিম দেশগুলোর প্রতি তার আহ্বান, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে। তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, সম্ভাব্য হামলার জবাবে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে জোরালো আঘাত হানার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ইরানি বাহিনী।

অন্যদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ ইরানের জ্বালানি খাতে আঘাত হানার প্রস্তুতি নিশ্চিত করলেও ওয়াশিংটন এখনো চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেয়নি। কারণ, এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টিও মার্কিন গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে। কুয়েত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে, ওমান উপকূলে জাহাজে হামলা হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে ইরান। এছাড়া ইরাকের কুর্দিস্তানে ড্রোন হামলা এবং হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরে সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরাক ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘদর সতর্ক করেছেন যে, অবরোধ ও হামলা বহাল থাকলে হরমুজ প্রণালির সংকট বাড়বে। তবে পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রাথমিক বার্তা আদান-প্রদান চলছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি বলেন, আমরা বিজয়ী হয়েছি এবং এই বিজয়কে স্থায়ী রূপ দিতে হবে। তেহরানের রাস্তায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার পোস্টার থাকলেও, পর্দার আড়ালে কূটনীতির দরজাও পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়নি।