হরমুজ ঘিরে উত্তেজনায় ইরানের অর্থনীতিতে চরম সংকট ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতার মাধ্যমে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখলেও, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। এই সংঘাত এখন কেবল কৌশলগত জলপথের আন্তর্জাতিক নৌচলাচলকেই বিঘ্নিত করছে না, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতিতেও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের হামলার মতো ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ কার্যকর করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অবরোধ অমান্যকারী ১২টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং দুটি জাহাজকে বিকল করা হয়েছে। এর মধ্যে চারমিনার নামক একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অভিযান চালানোর ভিডিও প্রকাশ করেছে মার্কিন বাহিনী, যা ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর কঠোর নজরদারির ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিদিন একাধিক জাহাজ ঘুরিয়ে দিচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জলবোমার আঘাতে একটি জাহাজ বিস্ফোরিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের মধ্যে ইরান ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি করেছে, যা তাদের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ। এছাড়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় আরও ৬৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি করা হয়েছে, যা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এবং খার্গ দ্বীপের মতো প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ায় এই আয়ের ধারা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের ওপর নির্ভরশীল। পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এবং জ্বালানি রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় সরকার এখন জ্বালানির দাম বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্তের কথা ভাবছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন যুদ্ধের আগের তুলনায় ২৩ কোটি ঘনমিটার কমেছে। এছাড়া প্রতিদিন ২ কোটি লিটারের বেশি পেট্রোল ঘাটতি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে লোডশেডিংয়ের ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিল্প কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব স্পষ্ট। চীনের সঙ্গে ইরানের তেল-বহির্ভূত বাণিজ্য আগের বছরের তুলনায় মার্চ ও জুনে ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অব্যবস্থাপনা এবং চলমান যুদ্ধের ফলে ইরানের দারিদ্র্যের হার ৪৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে 'সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউট'। সংকট সামাল দিতে সরকার পেট্রোল কোটার দাম দ্বিগুণ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে, যা অতীতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণ হয়েছিল। গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয় এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এতে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসে এবং ইরানের আঞ্চলিক জলসীমায় অপেক্ষমাণ সুপারট্যাঙ্কারগুলো থেকে তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বছরের প্রথমার্ধে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। এর আগে ডিসেম্বরে পেট্রোলের দাম এক দফা বাড়ানো হয়েছিল, যার কয়েক সপ্তাহ পরই জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরেও রাতারাতি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশব্যাপী মারাত্মক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

শনিবার (২৫ জুলাই) ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় তারা ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে (তবে এর সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি)। এছাড়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় আরও ৬৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি করা হয়েছে, যা বর্তমানে স্থ

গত ১৩ এপ্রিল আরোপিত আগের অবরোধটি দুই মাসের কিছু বেশি সময় ধরে চলেছিল। ওই সময়ে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল বলে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে। দীর্ঘস্থায়ী দ্বিতীয় অবরোধের কারণে ইরানের রপ্তানি আয় আরও কমার এবং খার্গ দ্বীপের ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।