‘মহারাজ’–এর সাফল্যের পর পরিচালক সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রার নতুন কাজ নিয়ে দর্শকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে তিন দশক পর পর্দায় সানি দেওল ও অক্ষয় খান্নাকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ আসায় প্রত্যাশার পারদ ছিল তুঙ্গে। ‘দামিনী’খ্যাত সানি দেওল যখন আবারও আইনজীবীর কালো কোট গায়ে জড়ান, তখন নব্বই দশকের নস্টালজিয়ায় ভোগা দর্শকদের রোমাঞ্চিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার ওপর সদ্য ‘ধুরন্ধর’ সিনেমায় খলনায়ক হিসেবে বাজিমাত করা অক্ষয় খান্না—সব মিলিয়ে ‘ইক্কা’ মুক্তির আগেই বলিউডের আলোচিত ওটিটি ছবিগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল।
১০ জুলাই নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর সিনেমাটি দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করেছে। নেটফ্লিক্সের টপ চার্টে এর প্রতিফলন দেখা যায়। মুক্তির পরপরই এটি বাংলাদেশের নেটফ্লিক্সের শীর্ষ ১০ সিনেমার তালিকায় প্রথম স্থান দখল করে নেয়। প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সিনেমাটি এখনো সেই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এ পর্যন্ত ছবিটির ভিউ হয়েছে প্রায় ২ কোটি।
সিনেমার গল্পটি আবর্তিত হয়েছে অর্জুন মেহরাকে ঘিরে, যিনি একজন নীতিমান আইনজীবী। তিনি কেবল নির্দোষদের পক্ষেই আদালতে লড়েন। আদালতে কেসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো সব সময় তাঁর পকেটে একটি ‘ইক্কা’ বা টেক্কা থাকে বলে সবাই তাঁকে এই নামেই ডাকে। অন্যদিকে শৌর্যমান গৌর নামে এক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ধনকুবেরের ছেলের বিরুদ্ধে এক তরুণীকে নিপীড়ন ও হত্যাচেষ্টার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। নীতিগত কারণে অর্জুন প্রথমে শৌর্যমানের কেস লড়তে না চাইলেও ব্যক্তিগত জীবনের এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আদর্শ বিসর্জন দিয়ে তাঁকে লড়তে হয়। নিজের পরিবারকে বাঁচাতে অর্জুন কি নিজের নৈতিকতাকে বলি দেন, নাকি ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে—তা নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘ইক্কা’র গল্প।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে সানি দেওল তাঁর পরিচিত গর্জন ও সংলাপের বাইরে এসে ব্যক্তিগত সংকট ও নীতিগত দ্বন্দ্বে দারুণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। অক্ষয় খান্না আবারও প্রমাণ করেছেন যে, উচ্চ স্বরে সংলাপ নয়, বরং চোখের ভাষা ও শরীরী অভিব্যক্তিই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। রহস্যময় শৌর্যমান গৌর চরিত্রে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনবদ্য। সরকারি আইনজীবী মধুরা চরিত্রে তিলোত্তমা সোম সংযত ও দৃঢ় অভিনয় করে আদালতের দৃশ্যগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। তবে দিয়া মির্জা, সানজিদা শেখ ও আকাঙ্ক্ষা রঞ্জন কাপুর তাঁদের চরিত্র অনুযায়ী অভিনয় করলেও খুব বেশি গভীরতা তৈরি করতে পারেননি।
সিনেমাটির শুরুটা বেশ জমাট ছিল এবং খুব কম সময়ের ভেতরেই দর্শক মূল গল্পে ঢুকে পড়েন। মামলার তথ্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়ায় কৌতূহল শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে। তবে বিরতির পর সেই ধার অনেকটাই হারিয়ে ফেলে ‘ইক্কা’। দ্বিতীয়ার্ধে এসে চিত্রনাট্য সেই ধূসর অঞ্চল থেকে বেরিয়ে অনেকটাই পরিচিত বলিউডি পথে হাঁটে। আদালতের আইনি লড়াইয়ের জায়গা দখল করে নেয় নাটকীয় মোড়, আবেগ আর কাকতালীয় কিছু ঘটনা। গল্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় স্বাভাবিক মনে হয় না, বরং মনে হয় গল্পকে এগিয়ে নিতে সেগুলো জোর করেই আনা হয়েছে। ফলে আদালতের টানটান লড়াই ধীরে ধীরে নায়ককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং কিছু টুইস্ট দর্শক আগে থেকেই ধারণা করতে পারেন।
সব মিলিয়ে শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী, অভিজ্ঞ পরিচালক এবং সম্ভাবনাময় গল্প থাকা সত্ত্বেও চিত্রনাট্যের দুর্বলতার কারণে ‘ইক্কা’ পুরোপুরি স্মরণীয় কোর্টরুম ড্রামা হয়ে উঠতে পারেনি। তারকাদের জনপ্রিয়তা আর নব্বই দশকের নস্টালজিয়াকে পুঁজি করে সিনেমাটি দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে পারলেও নিজের সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি। যাঁরা মূলধারার বলিউডি কোর্টরুম ড্রামা পছন্দ করেন, তাঁদের সিনেমাটি ভালো লাগতে পারে। তবে যুক্তিনির্ভর ও ধারালো কোর্টরুম থ্রিলার প্রত্যাশা করলে ‘ইক্কা’ দেখার অভিজ্ঞতা কিছুটা অপূর্ণই মনে হতে পারে।
রহস্যঘেরা ট্রেলার আর আদালতকেন্দ্রিক গল্প—সব মিলিয়ে ‘ইক্কা’ মুক্তির আগেই বলিউডের আলোচিত ওটিটি ছবিগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল।.একনজরেসিনেমা: ‘ইক্কা’ধরন: কোর্টরুম ড্রামা, থ্রিলারপরিচালক: সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রাচিত্রনাট্য: আলথিয়া কৌশল ও ময়ঙ্ক তিওয়ারিঅভিনয়: সানি দেওল, অক্ষয় খান্না, তিলোত্তমা সোম, দিয়া মির্জা, আকাঙ্ক্ষা রঞ্জ
আদালতের যুক্তি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনি লড়াইয়ের জায়গা দখল করে নেয় নাটকীয় মোড়, আবেগ আর কাকতালীয় কিছু ঘটনা।.৩০০ কোটি টাকা আয়; বাংলাদেশেও হিট; তবু অক্ষয়ের সিনেমার এই অবস্থা.সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, গল্প যেভাবে নিজেকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত কোর্টরুম থ্রিলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারে না।

