নতুন করে আস্থার সংকট এবং আমানত উত্তোলনের চাপের মুখে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২.১৪ শতাংশ, যা দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড।
এক সময় দেশের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান এই নাজুক পরিস্থিতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে এস আলম গ্রুপ ও তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণে থাকা সময়ে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ, প্রকৃত ঋণচিত্র গোপন রাখা এবং পরে এসব ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে।
বিপুল খেলাপি ঋণের প্রভাবে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রকৃত হিসাবে মূলধন ঘাটতি প্রায় ৯০ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এছাড়া চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল-জুন প্রান্তিতেই নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তারল্য সংকট, ব্যবসা কমে যাওয়া এবং আয় কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংকটির আর্থিক চাপ সামনে আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ৭ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৪.৪২ শতাংশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকৃত ঋণচিত্র যাচাইয়ের উদ্যোগ নিলে এই চিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা ১৭ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বর শেষে ৩২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা বা ৫৮.২৪ শতাংশ। পরে বিভিন্ন নীতি সহায়তা ও ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধায় ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকায় নামে। তবে চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে তা আবার বেড়ে ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা এবং জুন শেষে আরো ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা বেড়ে ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার জানান, ঋণগ্রহীতাদের পেমেন্ট বিহেভিয়ার বা কিস্তি পরিশোধে অনিয়মের কারণেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। তিনি বলেন, আগে যেসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, সেগুলোও সময়মতো কিস্তি পরিশোধ না করায় আবারও খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তায় অনেক ঋণের খেলাপি অবস্থা কমেছে, তবে কিছু ঋণগ্রহীতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্ত পূরণ করতে না পারায় সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এস আলম গ্রুপ থেকে ঋণ আদায়ের বিষয়ে তিনি জানান, তাদের সঙ্গে ব্যাংকের সরাসরি যোগাযোগ হয়নি, তবে বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপ ও এর কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ। এছাড়া তালিকার আরো ৫টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাবিল গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা।
মাত্র দুবছর আগেও ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪ সালের জুন শেষে ইসলামী ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এরপর বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে মূলধন অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান বেড়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বছরের প্রথম প্রান্তিকে পরিচালন লোকসান ছিল প্রায় ২৭৪ কোটি টাকা, ফলে প্রথম ৬ মাসে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
তবে চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে আবারও বাড়তে শুরু করে খেলাপি ঋণ। মার্চ শেষে তা দাঁড়ায় ৯৫.৬২৯ কোটি টাকা। জুন শেষে আরো ৩.২৮৬ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৮.৯১৫ কোটি টাকায়।
একই সময় ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ১,৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল-জুন প্রান্তিকেই নিট লোকসান হয়েছে ১০২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

