অর্থনীতির ১৯ সূচকে অবনতি, বন্ধ হয়েছে ৯৫ কারখানা: সিপিডি

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সার্বিক অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভসহ ১২টি খাতে অগ্রগতি অর্জিত হলেও মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু ঋণসহ বাকি ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে তীব্র অবনতি ও গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর একটি মিলনায়তনে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক সাহসের ওপর জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে আইন তৈরি, প্রয়োগ ও নজরদারি হয়, সেগুলোকে সরকার স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে দেবে কি না। পুরনো সরকারের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে কি না, তার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এগুলোকে আবার রাজনৈতিকীকরণের দিকে নেওয়া হচ্ছে কি না। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক পদায়ন করা হলে এর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার নিজেই। অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর রাখার তাগিদ দেন তিনি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয় মন্তব্য করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক সাহস দেখিয়ে নিজের দলের লোকজনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন কি না এবং আমলাদের যথাযথ জায়গায় রাখতে পারেন কি না, এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকারকে ‘এ’ দিতে চাইলেও বাস্তবতা তাকে ‘বি’র দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কার্যক্রমে অনেক ‘নয়েজ’ থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ‘মিউজিক’ পাওয়া যাচ্ছে না।

সিপিডি’র প্রতিবেদনে দেশের শিল্প খাতের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ সময়কালের মধ্যে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমে এসেছে এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি জটিলতা ও গ্যাস সংকটের কারণে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ নিয়েও বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সিপিডি। তাদের হিসাবে, অর্থবছরের নির্ধারিত ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও বাস্তবে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঘাটতি হতে পারে। এই ঘাটতি নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে এবং মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে নিট বৈদেশিক সহায়তাও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়ে সিপিডি জানায়, মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক রয়ে গেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হলেও আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে এবং মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত এখন ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আরএমজি বহির্ভূত রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তদুর্ধ্ব বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক বলা হয়েছে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সিপিডি সরকারের প্রতি অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, এডিপি ও বেতন কমিশনসহ একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার পাশাপাশি সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সংসদে ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনেরও তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। সিপিডি মনে করে, বাংলাদেশ এখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে অর্জিত স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর এবং বিচ্ছিন্ন ঘোষণা নয়, বরং সময়াবদ্ধ সংস্কার বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি।