বেতন-ভাতার সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকলে পরিস্থিতি জটিল হবে: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সাহসের অভাব দেখছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না, বরং যত দেরি হবে পরিস্থিতি তত বেশি জটিল আকার ধারণ করবে। সোমবার ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারের গত ছয় মাসের কার্যক্রমের ওপর এই সংলাপের আয়োজন করে সংস্থাটি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। সংলাপে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, কেন ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও বেতন-ভাতার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না? এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেন তিনি। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও সেখান থেকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বেতন-কাঠামোর প্রতিবেদন মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের একটি সুপারিশ এসেছিল, যা সবাই গ্রহণও করেছিল। তিনি মনে করেন, শুরুতেই যদি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে কিছুটা সময় চেয়ে নেওয়া হতো, তবে তা অনেক ভালো হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিকে ঝুলিয়ে রেখে পরিস্থিতিকে ভালো দিকে নেওয়া হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজও ব্যাহত হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সংলাপে দেশের শিল্প খাতের সংকটের চিত্রও তুলে ধরা হয়। সিপিডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে দেশের ৩টি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৬১ হাজার ৮৮১ জন মানুষ।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছিল এবং সে সময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। উপরন্তু যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তবে তাঁর মতে, বড় সমস্যা হলো দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে এই সরকার কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করেনি। এর ফলে বর্তমানের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের মিল খুঁজে পাওয়াও এখন দুরূহ।

নতুন সরকারের কাছে জনগণের দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তবে এই দুই ক্ষেত্রে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রে কোনো সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি এবং ইশতেহারে ঘোষিত অনেকগুলো কমিশনও এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সরকারের নেওয়া প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের একটি তালিকা তৈরি করে ৯টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করছে সিপিডি।

সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নে রাখা হয়েছে বলে সংলাপে জানানো হয়। এর মধ্যে সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সংস্থাটি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তার ব্যত্যয় ঘটেছে।

এত দেরি না করে শুরুতেই যদি ২০-২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে দিতেন আর সময় প্রার্থনা করতেন, সেটা খুব ভালো হতো।