লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে ইয়েমেন ও জিবুতির মধ্যবর্তী কৌশলগত জলপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি এখন ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এই পথ হারানোর আশঙ্কা থেকে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতি কতটা অস্থিতিশীল। ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হুতিরা বন্দরনগর মোখা দখলের পাশাপাশি নৌপথটির মাঝখানে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের ওপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। কয়েক সপ্তাহ ধরে এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকির পর হুতিরা এই নিয়ন্ত্রণ জোরদার করল। বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এটি একটি নতুন ফ্রন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ায় বিশ্ববাণিজ্যে বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। সৌদি আরব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জের হিসাবে, একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল-মানদেব দিয়ে যেত। কিন্তু হুতিদের হামলার হুমকির কারণে আগস্টে বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।
এই জলপথ এড়িয়ে বিকল্প পথে জাহাজ চলাচলের কারণে পরিবহন খরচ ও সময় উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা যাত্রার সময় প্রায় এক মাস পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে জাহাজভাড়া ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারে উঠলেও পরে তা কমে ১০৪ ডলারে নেমে আসে। সব মিলিয়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত কোনো সমাধানের লক্ষণ না থাকায় শোধনাগারগুলোকে উচ্চমূল্যে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করতে হবে, যা ডিজেলের মতো জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দেবে। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
জেনেটা নামক প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা আরও ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পিটার স্যান্ডের মতো বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদিও জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবুও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রতিটি জাহাজই এখন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

