ত্রাণের আশায় আঙুলের ছাপ দিয়ে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় সংকটে স্থানীয়রা

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপকূলের চরম দারিদ্র্যপীড়িত পাঁচ শতাধিক স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিক এক মারাত্মক আইনি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল নামার পর, অভাবের তাড়নায় ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে আঙুলের ছাপ দেওয়ার ফলে তারা এখন আন্তর্জাতিক ডাটাবেজে ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে তারা বুঝতে পারেননি যে, বেঁচে থাকার জন্য সামান্য চাল-ডাল-তেলের বিনিময়ে দেওয়া ওই আঙুলের ছাপ তাদের নাগরিক পরিচয়ে চিরস্থায়ী সংকট তৈরি করবে। এর ফলে বর্তমানে তারা পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

নিজেদের পরিচয় প্রকাশের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী পরিবারই আড়ালে থাকতে চাইছেন। উখিয়ার এক দুর্গম গ্রামের ৬৫ বছর বয়সি এক দিনমজুর জানান, খিদের জ্বালায় ছোট সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার আশায় তিনি ত্রাণ নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন মেশিনে আঙুলের ছাপ ও ছবি নেওয়ার সময় তারা বুঝতে পারেননি যে এটি তাদের আজীবনের জন্য ‘রোহিঙ্গা’ বানিয়ে দেবে। একই ধরনের ভুক্তভোগী টেকনাফের নয়াপাড়া শিলখালী গ্রামের ৪৬ বছর বয়সি ছেনুয়ারা বেগম। জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ও এনআইডিধারী হওয়া সত্ত্বেও, ২০১৭ সালে ত্রাণ কার্ডের জন্য বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করায় ডাটাবেজে তার নাম এখন ‘রহিমা’। নিজ জন্মভূমিতেই তিনি এখন এক ‘ছায়ামানব’ হিসেবে জীবন যাপন করছেন।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, তার এলাকার ১১ বছরের শিশু গুরায়াও একই পরিস্থিতির শিকার। না বুঝে ত্রাণ নিতে গিয়ে বায়োমেট্রিক মেশিনে আঙুলের ছাপ দেওয়ায় ডাটাবেজ তাকে এখন ‘নিবন্ধিত রোহিঙ্গা’ দেখাচ্ছে। তার মতো আরও অন্তত ৭০ জন মানুষ কেবল এই ইউনিয়নেরই ভুক্তভোগী, যারা কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার সুযোগে অন্তত ৩০০ জনের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক এই জটিলতায় পড়েছেন। এটি আন্তর্জাতিক ডাটাবেজের বিষয় হওয়ায় তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ভুক্তভোগীরা নিজেদের বাংলাদেশি প্রমাণের জন্য কার্ড বাতিলের আবেদন করছেন। প্রশাসন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি কার্যকর সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা চলছে।