খাদ্যে ভেজাল: জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক, প্রতিকারে নেই কার্যকর ব্যবস্থা

সকালের নাশতায় এক কাপ চায়ের সঙ্গে এক টুকরো পাউরুটি অনেকের কাছেই সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু সেই পাউরুটিই যদি তৈরি হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে, তবে তা ডেকে আনতে পারে মরণব্যাধি। বর্তমানে দেশের বাজারে পাউরুটি, শিশুদের খাবার, তেল, মসলা, দুধ, ফল ও শাক-সবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যেই ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়তি লাভের আশায় শিল্পজাত রাসায়নিক, ক্ষতিকর রং ও নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করছে, যা খাদ্যে ভেজালকে দেশের অন্যতম ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে মারা যান। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি, লবণ, চর্বি এবং ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণ এসব মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬৮টি বা ৩৩.৪ শতাংশ নমুনায় ভেজাল বা দূষণের প্রমাণ মিলেছে। এসব পণ্যে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও ভারী ধাতু শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে চিপসের ৬৫ শতাংশে ক্ষতিকর রাসায়নিক অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া গেছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি ডিডিটি ও বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে ৮২টি খাদ্যপণ্যে। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। এমনকি মুরগি ও মাছেও মিলেছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক।

বাজারে শিশুদের জন্য নকল ও ভেজাল ওটস বিক্রির একটি চক্রও সক্রিয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কোয়েকার, হেলথ প্যারাডাইস ও কাউহেডের মোড়কে ভুসি ও চালের কুড়া মিশিয়ে এসব নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। রাজধানীর রায়েরবাগ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, কেরানীগঞ্জ, ডেমরা ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এমন অসংখ্য কারখানা।

বিএফএসএ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করলেও ভেজাল বন্ধ হচ্ছে না। সম্প্রতি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কেক ও পাউরুটি তৈরির দায়ে ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেডের ‘ইস্ট কেক পুর পিঠা জ্যাম’, ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ‘ইস্ট বেকার স্লাইস ব্রেড মিল্ক জ্যাম’ এবং আরবোটিং ফুড কোম্পানি লিমিটেডের ‘আরবোটিং ফুড স্লাইস ব্রেড মিক্স জ্যাম’ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ২৩শে জানুয়ারি সাভার ও কেরানীগঞ্জে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বসুন্ধরা সিটির আলমাস সুপার শপকেও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে ছাড়পত্রবিহীন শিশু খাদ্য বিক্রির অভিযোগে। এছাড়া গত ২৩শে জুলাই রাজধানীর সবুজবাগে ‘সোনার মদিনা’ নামক প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযানে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করা হলেও বড় অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না। বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান নিউট্রোলোজিস্ট শামসুন নাহার মহুয়া বলেন, সুস্থ থাকতে হলে অস্বাস্থ্যকর ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করে বাড়িতে তৈরি খাবারের অভ্যাস গড়তে হবে। কনজ্যুমার এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এস এম নাজের আহমেদ মনে করেন, অভিযানের তুলনায় জরিমানা নগন্য হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আইনকে তোয়াক্কা করছে না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুব কবির মিলন জানান, ফুড সেফটি অথরিটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারা এবং লোকবল ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাই ভেজাল রোধের প্রধান অন্তরায়। বিএসটিআইয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত বাজার তদারকি ব্যাহত হচ্ছে এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার একই অপরাধ করছে।