জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত চারগুণ ও মৃত্যু তিনগুণ বেড়েছে

মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়েছে। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জুন মাসে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, যা জুলাই মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২০৬ জনে। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে; জুনে ১৩ জনের মৃত্যুর বিপরীতে জুলাইয়ে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৬ জন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১৫ হাজার ৩১০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন, জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন এবং জুলাই মাসে ৯ হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ, চলতি বছরের মোট আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৬১ শতাংশই জুলাই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সাত মাসে মোট ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে ১ জন, জুনে ১৩ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ, এ বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৭ শতাংশই ঘটেছে শুধু জুলাই মাসে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছর দেশের ৫৬ জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। জেলাগুলো হলো—ঢাকা, ফরিদপুর, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। এর মধ্যে অন্তত ২৭ জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টির পাশাপাশি গরম আবহাওয়া এডিস মশার প্রজননের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেছেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং এডিস মশার প্রজননের নতুন নতুন উৎস শনাক্ত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, এখন গ্রাম ও শহরের পরিবেশগত পার্থক্যের সীমা কমে এসেছে। গ্রামেও বহুতল ভবন, পাকা রাস্তা ও অব্যবহৃত যানবাহনে পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটছে। তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত কৌশলের পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, শুধু রাসায়নিক ধোঁয়া ছিটানো বা আইসিইউ প্রস্তুত রাখা যথেষ্ট নয়। এর পরিবর্তে তৃণমূল পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা জরুরি। একই সঙ্গে, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যাতে রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।