বিতর্ক ও বিরোধীদের আপত্তির মুখে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামের একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন। বিলটি উত্থাপনে বিরোধী দল আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত তা পরীক্ষা করে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
২০০৩ সালে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ সংশোধন করে বিতর্কিত এই বাহিনী র্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত এই বাহিনীটি বিলুপ্তির দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাব এবং এর সাবেক ও তৎকালীন সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘ ও গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও এটি বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। এখন সেই অধ্যাদেশের র্যাব-সংক্রান্ত বিধান বাদ দিয়ে বাহিনীটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী, কাগজে-কলমে র্যাব বিলুপ্ত হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা, জনবল, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি ও নথিপত্র সবই নতুন এসআরবি ইউনিটে স্থানান্তরিত হবে। র্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন এই ইউনিটের সদস্য হিসেবে যুক্ত হবেন এবং চলমান মামলা ও চুক্তিগুলো এসআরবির নামেই পরিচালিত হবে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, পুলিশের এই বিশেষায়িত ইউনিট গঠনে সরকার পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা ও সশস্ত্র সদস্যদের প্রেষণে বা পদায়নে নিয়োগ দেবে। অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এসআরবির মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই ইউনিটের নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও স্বতন্ত্র পোশাক থাকবে। এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও মালামাল জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাহিনীটির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া নাগরিকদের অভিযোগ এবং সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নিষ্পত্তির জন্য একটি বহুপক্ষীয় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধানও রয়েছে এই খসড়া আইনে। নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত ২০০৫ সালের বিদ্যমান বিধিমালার অধীনেই র্যাব-সংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলা ও আদালতের কার্যক্রম বহাল থাকবে।
বিলটি উত্থাপনের সময় তীব্র আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ‘আয়নাঘর’ প্রতিষ্ঠার কারণে র্যাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চরম বিতর্কিত হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল র্যাব বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও র্যাবের মতো আরেকটি বাহিনী গঠনের কথা বলেনি। এটিকে ‘র্যাব ফ্যাসিবাদের চিহ্ন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বিলটি বাতিলের দাবি জানান এবং নতুন ইউনিট গঠনের আগে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার আহ্বান জানান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নাহিদ ইসলাম যখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন, তখনই এই প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদে উত্থাপন করলে তিনি খুশি হতেন। পুলিশের সাবেক প্রধান বেনজীর আহমেদের উদাহরণ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, সাবেক আইজিপি ‘কুখ্যাত বেনজীর’ ছিলেন বলে কি পুরো পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করে দেওয়া হবে? তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী র্যাব নামক সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে, তবে পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান র্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও নতুন সংস্থা গঠনের আগে সবার সম্মতি ও চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়ে বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন, যা পরীক্ষা করতেও সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। নতুন এই বিলে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়নসহ অন্যান্য ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এপিবিএনকেও ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এই আইনের আওতায় ইউনিটের কোনো সদস্য কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রে কোনো তথ্য বা দলিল প্রকাশ কিংবা প্রকাশের কারণ হতে পারবেন না।

