দক্ষিণ এশিয়ার বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্রের সংকট: একটি গভীর পর্যবেক্ষণ

নেপালের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় সহাবস্থান ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত নেপালেও এখন ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এগুলো মূলত একই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং বহুত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার টিকে থাকা এখন এক বড় প্রশ্নের মুখে।

বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় অঞ্চলগুলোর একটি এই দক্ষিণ এশিয়া। শত শত ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির সহাবস্থানই এই সভ্যতার মূল শক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বহুত্ববাদ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভোটের সমীকরণ নির্ধারণে ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বদলে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক আস্থা ও নাগরিক সংহতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে 'মেজরিটারিয়ানিজম' বা সংখ্যাগুরুবাদ বলা হয়, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনৈতিক ক্ষমতা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

ভারতের গত এক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মনিরপেক্ষতা ও আইনের সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দেশটির সংবিধান থাকলেও সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মসজিদ-মন্দির বিরোধ, সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে বুলডোজার অভিযান এবং ঘৃণামূলক রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শ্রীলঙ্কার যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিও একই শিক্ষা দেয়—পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে। নেপালের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের পরেও গুজব ও পরিচয়ভিত্তিক সংগঠনের উত্থান ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, বরং এটি প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়। যদিও রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ অতীতে পূজামণ্ডপে হামলা বা গুজব সৃষ্টিকারী ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তবুও রাজনৈতিক ভাষার পরিবর্তন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অমর্ত্য সেন যেমনটি বারবার বলেছেন, ভারতীয় সভ্যতার শক্তি তার যুক্তিনির্ভর বিতর্কের ঐতিহ্য। কিন্তু যখন রাজনৈতিক ভাষা প্রতিপক্ষকে 'শত্রু' বা 'অবিশ্বাসী' হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন তা সামাজিক সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করে। রুয়ান্ডা বা যুগোস্লাভিয়ার মতো ইতিহাসের করুণ ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয় যে, গণহত্যা অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং ভাষা দিয়ে শুরু হয়।

গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে বিচার করলে ভুল হবে। বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তা কেবল 'ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসি'তে পরিণত হয়। বহুত্ববাদ গণতন্ত্রের বিলাসিতা নয়, বরং এর অস্তিত্বের শর্ত। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সামনে আজ চ্যালেঞ্জ হলো সংখ্যাগুরুবাদী আবেগ ত্যাগ করে সাংবিধানিক নাগরিকত্বকে শক্তিশালী করা। বহুত্ববাদ কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিপক্বতার লক্ষণ। যদি এই সংকট নিরসনে এখনই রাজনৈতিক সংযম ও বহুত্ববাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা না যায়, তবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।