আর্থিক সংকটে জর্জরিত ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আদিল চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। তিন বছরের চুক্তিতে গত বছরের ৭ জুলাই ব্যাংকটিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু এক বছরের মাথায়ই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন। জানা গেছে, তিনি এখন এবি ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছেন, যা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন করেছে। আগামী সপ্তাহে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ন্যাশনাল ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগে আদিল চৌধুরী ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আদিল চৌধুরীর সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক ছেড়ে এবি ব্যাংকে যাচ্ছেন আরও প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা, যাদের তিনি গত এক বছরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকে নিয়ে এসেছিলেন। এবি ব্যাংক ইতিমধ্যে তাঁদের নিয়োগপত্র প্রদান করেছে। গত ২৭ জুলাই আদিল চৌধুরী তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা আজ শুক্রবার কার্যকর হচ্ছে। এর আগে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মো. তৌহিদুল আলম খান, তিনিও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছিলেন।
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবিন জানিয়েছেন, এমডির পদত্যাগ আজ শুক্রবার কার্যকর হবে। তিনি বলেন, এখন তারা নতুন এমডি নিয়োগ দেবেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তিকে খুঁজছেন যিনি ব্যাংকের উন্নতির জন্য কাজ করে যাবেন এবং গ্রাহকের আস্থা ধরে রেখে খেলাপি ঋণ আদায়ে মনোযোগী হবেন। এছাড়া ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেওয়া ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
একসময় সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক বর্তমানে মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর সিকদার গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায়। ব্যাংকটি বর্তমানে উচ্চ খেলাপি ঋণ, ধারাবাহিক লোকসান ও গ্রাহকদের টাকা তোলার সমস্যার মতো সংকটে ভুগছে।
পরিচালনা পর্ষদের নথিপত্র অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যাংকটির সব সূচকের অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি ঋণের সুদ থেকে আয় করেছে ৩০২ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪৬০ কোটি টাকা। চলতি বছরের ছয় মাসে আমানতকারীদের সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে ২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটি চলতি বছরে আয় করেছে ৪৬ কোটি টাকা, যা গত বছরে ছিল ৫৯১ কোটি টাকা। অন্যান্য পরিচালন আয়ও কমেছে। ফলে সুদ আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকটি লোকসান গুনেছে ২ হাজার ৪২ কোটি টাকা। পরিচালন কার্যক্রমে লোকসান দিয়েছে ১ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। বেতন–ভাতা ও অন্যান্য খরচ কমিয়ে আনার পরও গত ছয় মাসে লোকসান বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯৯২ কোটি টাকা।
ব্যাংকটি পরিচালনা পর্ষদকে জানিয়েছে, পুনঃ তফসিল করা ঋণের বিপরীতে কিস্তি শোধ না হওয়ায় সুদ আয় কমেছে এবং ট্রেজারি বন্ড থেকে আয় না হওয়ায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে। সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকটি তাদের পান্থপথ মোড়ের সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম পাশে নির্মাণাধীন ‘টুইন টাওয়ারের’ একটি ভবন বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ অনুমোদন পেয়েছে। অন্য ভবনটিতে হবে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। ব্যাংকটি ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর লোকসান গুনছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের দেওয়া মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি, যা পরিমাণে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে এবং এখনো লোকসানে রয়েছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে টাকা আদায়ে উদ্যোগী এবং সব শ্রেণির কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে সক্ষম এমন একজন সক্রিয় এমডিই এখন ব্যাংকটির জন্য জরুরি।

