বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধেও ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র, হুতিদের কাছে নতিস্বীকার

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা ও গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের এই সামরিক অগ্রগতি বৈশ্বিক তেলবাণিজ্যকে নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। ইরান-সমর্থিত এই শক্তিশালী গোষ্ঠীকে দমনে বিপুল অর্থ খরচ করে ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামক সামরিক অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শেষ পর্যন্ত প্রধান মিত্র ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়েই হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে বাধ্য হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাকে বিশ্লেষকেরা ওয়াশিংটনের বড় ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন।

লোহিত সাগরের সংকীর্ণ প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির ঠিক ভেতরে অবস্থিত ময়উন বা পেরিম দ্বীপটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা। এর আগে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় হুতিরা। এর জবাবে সৌদি আরব মোখা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে। আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এখন হুতিদের এই অগ্রাভিযান বৈশ্বিক তেলের বাজারকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

২০২৫ সালের বসন্তে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার তীব্রতা বাড়লে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ব্যয়ের বিশাল অভিযান ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ শুরু করেন। এই অভিযানে ইয়েমেনের আট শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হলেও হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কমানো যায়নি। ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ইরানের অব্যাহত সহায়তার ওপর ভর করে হুতিরা উল্টো মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সামুদ্রিক আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এর আগে জো বাইডেনের আমলে পরিচালিত ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ অভিযানটিও একইভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।

মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার তথ্য ‘সিগন্যাল’ অ্যাপে ফাঁস হওয়া এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব ওয়াশিংটনের এই ব্যর্থতাকে আরও ত্বরান্বিত করে। অবশেষে অভিযানের দুই মাসের মাথায়, ৬ মে ওমানের মধ্যস্থতায় হুতিদের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করলেও ইসরায়েলের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে। এই চুক্তি সম্পর্কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইসরায়েল ইয়েমেনের হোদেইদা বন্দর ও সানা বিমানবন্দরে পাল্টা হামলা চালায়। হুতিদের এই চুক্তিকে তাদের বিজয় এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল পরাজয়’ বলে উল্লেখ করেছেন হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি। অন্যদিকে প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট একে ‘আত্মা বিক্রির চুক্তি’ বা ‘ডিল উইথ দ্য ডেভিল’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

হুতিদের এই সক্ষমতা অর্জনের পেছনে ইরানের সরাসরি সামরিক ও কৌশলগত অবদান রয়েছে। গত ১৩ জুলাই তেহরান থেকে মাহান এয়ারের একটি ফ্লাইটে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা এবং মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠানো হয়। জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন, বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোট এবং সাগরে মাইন পুঁতে রাখার সক্ষমতা দিয়ে হুতিরা মার্কিন রণতরিগুলোর চলাচলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি উপকূল পেরিয়ে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম।

হুতিদের এই শক্তিমত্তার পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বু মনসুর হাদিকে দেশছাড়া করার পর তারা আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। ২০১৫ সালের মার্চে তাদের দমনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট বিমান ও স্থল হামলা শুরু করলেও ইরান-সমর্থিত হুতিদের পরাজিত করতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে ওই বছরের নভেম্বর থেকে লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা শুরু করে হুতিরা। ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি গাজায় প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির সময় তারা সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ রাখলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আকস্মিক সংঘাতের পর হুতিরা পুনরায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানা শুরু করে।

বর্তমান ভূ geopolitics বা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরে নিজেদের তেল পরিবহন নিরাপদ রাখতে সৌদি আরব তাদের বিশাল ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ইরাকের ইরানপন্থী গোষ্ঠীর ড্রোন হামলার পর প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল ইউরোপে সরবরাহকারী এই পাইপলাইনটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অন্তত দুবার ফোন করেন। তবে ওয়াশিংটন রিয়াদকে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে অস্বীকৃতি জানিয়ে কেবল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। হুতিদের কড়া জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মানচিত্রে নতুন একটি বিপজ্জনক রণাঙ্গন উন্মুক্ত করার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।