২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অনিয়মিতভাবে সীমান্ত পারাপারের ঘটনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। তবে এই ইতিবাচক প্রবণতার মধ্যেও একটি উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। ভূমধ্যসাগরের প্রধান দুটি সমুদ্র পথ ব্যবহার করে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা।
ইউরোপের সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ৭৫ হাজার অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। প্রায় সবকটি প্রধান অভিবাসনপথেই এবার অনিয়মিত প্রবেশ কমেছে। ফ্রন্টেক্স মনে করছে, অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাস্থলগুলোতে নেওয়া প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের ফলেই ইউরোপমুখী নৌকার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
অবৈধ অনুপ্রবেশের সংখ্যা কমলেও সমুদ্রযাত্রার মানবিক ঝুঁকি ও মূল্য কমেনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে ইইউর বহির্সীমান্তে ৩ হাজার ৮০০ কর্মকর্তা মোতায়েন রেখেছে ফ্রন্টেক্স, যারা ইউরোপের সীমান্ত সুরক্ষা এবং সমুদ্রে মানুষের জীবন রক্ষায় জাতীয় কর্তৃপক্ষগুলোকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, জুলাইয়ের শেষ দিকে মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতা (Ceuta) অঞ্চলে ব্যাপক মানুষের প্রবেশের ঘটনাটি এই পরিসংখ্যানে যোগ করা হয়নি। কারণ, সীমান্ত অতিক্রমকারীদের বেশিরভাগই নিবন্ধন ছাড়াই মরক্কোতে ফিরে গেছেন, ফলে তাদের চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। শুধু আগস্ট মাসেই প্রায় ১০ হাজার ৭০০টি অনিয়মিত সীমান্ত পারাপার শনাক্ত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম। সাধারণত গ্রীষ্মকালে অভিবাসনের চাপ বেশি থাকলেও এবার পতন দেখা গেছে। এই সময়ে ইইউর নতুন ‘প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম’র অধীনে প্রথম পূর্ণ গ্রীষ্মকাল পার হয়েছে, যেখানে অভিবাসীদের জাতীয়তা নির্ধারণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও নথি যাচাইয়ের জন্য একটি একক স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে।
বিভিন্ন অভিবাসন পথের মধ্যে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জনের প্রবেশ শনাক্ত করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কম। এ পথে প্রধান যাত্রাস্থল হিসেবে লিবিয়া থেকে মোট প্রবেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হয়েছে। এরপর ছিল আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে আসা অভিবাসনপথ। লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার কর্তৃপক্ষের অভিযান, আটক ও ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমের কারণে এ পথে নৌযাত্রা কমেছে। তবে এই পথে শনাক্ত হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি, সোমালি ও আলজেরীয়দের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে সবচেয়ে ব্যস্ত ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথ। এ পথে ২৪ হাজার ২০০-এর বেশি সীমান্ত পারাপার শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। এ পথের সবচেয়ে সক্রিয় অংশ ছিল লিবিয়া থেকে ক্রিট দ্বীপমুখী করিডর। তবে জুলাই নাগাদ তুরস্কের সঙ্গে স্থলসীমান্ত এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে ব্যস্ত অংশে পরিণত হয়। আগস্টে এ পথে প্রায় ৩ হাজার পারাপার শনাক্ত হয়, যেখানে প্রধান জাতীয়তার মধ্যে ছিলেন আফগান, সুদানি ও বাংলাদেশি নাগরিকরা।
প্রধান পথগুলোর মধ্যে একমাত্র পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথেই অনিয়মিত প্রবেশ বেড়েছে। এ পথে প্রায় ১৫ হাজার ৯০০টি পারাপার শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। আলজেরিয়াকে প্রধান যাত্রাস্থল করে বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ ও স্পেনের মূল ভূখণ্ডের দিকে এই যাত্রা হয়েছে। মরক্কো, পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য ভূমধ্যসাগরে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে মানব পাচারকারীরা পথ পরিবর্তন করে আলজেরিয়া উপকূলকে ব্যবহার করছে বলে ফ্রন্টেক্স জানিয়েছে। তবে পশ্চিম আফ্রিকান পথে সীমান্ত পারাপার সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৫৮ শতাংশ কমে প্রায় ৫ হাজার ১০০-তে দাঁড়িয়েছে। মরিতানিয়া ও সেনেগালের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের কারণে এ পথে নৌযাত্রা কমলেও পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। জুলাইয়ে মৌসুমি কারণে গাম্বিয়া, সেনেগাল ও গিনি-বিসাউ থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করা নৌকার সংখ্যা বাড়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এছাড়া ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টাও ৪৩ শতাংশ কমে প্রায় ২৬ হাজার ৬০০টিতে দাঁড়িয়েছে। মানব পাচারকারী চক্রগুলো অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকা ব্যবহার করায় ঝুঁকি বেড়েছে; এমনকি জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি নৌকায় ১৬৫ জনকে বহন করতে দেখা গেছে। তবে গত এপ্রিলে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলে আগামী মাসগুলোতে ফরাসি উপকূলে টহল আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

