দোয়ার সময় আল্লাহর অসংখ্য নামের মধ্য থেকে কোন নামে ডাকলে তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন এবং প্রার্থনা দ্রুত কবুল হবে, তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নিজেই এর সমাধান দিয়ে রেখেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, কাউকে নির্দিষ্ট নাম ধরে ডাকলে তাদের মধ্যে সম্পর্ক অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও গভীর হয়। ২০০৬ সালে আয়ারল্যান্ডের এলসেভিয়ারের 'ব্রেন রিসার্চ' জার্নালে প্রকাশিত ডি. পি. কারমোডি ও এম. লুইসের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, নাম ধরে ডাকা মানুষের মস্তিষ্কে এমন এক সংযোগ তৈরি করে, যা সাধারণ যোগাযোগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী।
পবিত্র কোরআনের সুরা আরাফের ১৮০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং সেই নামগুলো দিয়েই তাঁকে ডাকো।’ অর্থাৎ, আল্লাহর সুন্দর নামগুলোর অর্থ ও গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে যখন আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁকে ডাকা হয়, তখন সেই মিনতি সরাসরি হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে এবং তা আর সাধারণ কোনো ডাক থাকে না।
আল্লাহর বিভিন্ন নামের মধ্যে অন্যতম হলো 'আর-রহমান', যার অর্থ সীমাহীন দয়ার মালিক। সুরা বনি ইসরাইলের ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বলো, আল্লাহ বলে ডাকো অথবা রহমান বলে ডাকো। যে নামেই ডাকো না কেন, তাঁর জন্য রয়েছে সুন্দর নামসমূহ।’ 'রহমান' শব্দটি কেবল আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত, যার মূলে রয়েছে 'রহম' বা গর্ভ ও মাতৃস্নেহ। নিজের পাপের বোঝা অনেক বেশি মনে হলে 'ইয়া রহমান' বলে ডাকা উচিত। আবার বারবার পাপ করার পর ক্ষমা চাইতে লজ্জা লাগলে ডাকতে হবে 'আল-গাফফার' নামে। ব্যাকরণগতভাবে 'গাফফার' মানে অতিমাত্রায় বা বারবার ক্ষমাকারী। সুরা ত্বহার ৮২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর নিশ্চয়ই আমি তার জন্য অত্যন্ত ক্ষমাশীল যে তাওবা করে, ইমান আনে, সৎ কাজ করে এবং সঠিক পথে চলে।’
চাওয়ার আগেই যিনি দান করেন, তিনি হলেন 'আল-কারিম'। সুরা ইনফিতারের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, ‘হে মানুষ, কোন জিনিস তোমাকে তোমার মহামহিম প্রতিপালকের ব্যাপারে প্রতারিত করল?’ এখানে 'রাব্বিকাল কারিম' বা তোমার মহামহিম প্রতিপালক বলে আল্লাহ মানুষের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নির্দেশ করেছেন। রিজিক বা জীবিকার দুশ্চিন্তায় থাকলে 'ইয়া কারিম' বলে ডাকা উচিত। অন্যদিকে, ডাকলে যিনি অবশ্যই সাড়া দেন, তিনি হলেন 'আল-মুজিব'। সুরা হুদে নবী সালেহ (আ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে ৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক কাছেই আছেন এবং দোয়া কবুল করেন।’ 'কারিবুন মুজিব' শব্দের অর্থ হলো যিনি নিকটে আছেন এবং সাড়া দেন। 'ইয়া মুজিব' বলে ডাকলে সেই সত্তাকেই ডাকা হয়, যাঁর কাছে কোনো ডাক কখনো শূন্যে হারিয়ে যায় না।
আল্লাহর আরেকটি সুন্দর নাম হলো 'আল-ওয়াদুদ', যার অর্থ যাঁর গভীর ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না। সুরা বুরুজের ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি ক্ষমাশীল, ভালোবাসাময়।’ এখানে ক্ষমা ও ভালোবাসা পাশাপাশি উল্লেখ করে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহ ভালোবাসা থেকেই বান্দাকে ক্ষমা করেন। আবার বান্দা যখন বারবার তাওবা করে ফিরে আসে, তখন 'আত-তাওয়াব' নামে ডাকলে আল্লাহ অত্যন্ত আনন্দিত হন। সুরা বাকারার ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তিনি বারবার তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ বান্দা এক পা এগোলে আল্লাহ তাঁর দিকে আরও বেশি এগিয়ে আসেন।
সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন নাম হলো 'আল-হাই আল-কাইয়ুম'। সুরা bাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতে (আয়াতুল কুরসি) বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বদা বিদ্যমান।’ 'আল-হাই' মানে যিনি চিরঞ্জীব, ক্লান্তহীন ও নিদ্রাহীন; আর 'আল-কাইয়ুম' মানে যিনি সবকিছু ধরে রাখেন ও নজর রাখেন। রাতের শেষ প্রহরে 'ইয়া হাই ইয়া কাইয়ুম' বলে ডাকলে বান্দার প্রতি আল্লাহর বিশেষ মনোযোগ তৈরি হয়। সহিহ বুখারির ২৭৩৬ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর ৯৯টি নাম আছে। যে ব্যক্তি এগুলো আয়ত্ত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ এখানে আয়ত্ত করার অর্থ হলো নামগুলোর মর্মার্থ বুঝে সেই অনুযায়ী আল্লাহকে ডাকা।
বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ইবনুল কাইয়িম (রহ.) তাঁর 'মাদারিজুস সালিকিন' গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৪৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘আল্লাহর নামগুলো জানা এবং সেগুলো দিয়ে ডাকা হলো দোয়ার সবচেয়ে গভীর পথ। কারণ তখন বান্দা শুধু চাইছে না, আল্লাহকে চিনে চাইছে।’ তাই রিজিক চাইলে 'ইয়া রাজ্জাক', ক্ষমা চাইলে 'ইয়া গাফফার', সাহায্য চাইলে 'ইয়া মুজিব' এবং ভালোবাসা পেতে 'ইয়া ওয়াদুদ' বলে ডাকা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের খণ্ডকালীন শিক্ষক মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর এই নামগুলোর নিহিত তাৎপর্য ও প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
& Lewis, M., 2006, Brain Research, 1116/1, এলসেভিয়ার, আয়ারল্যান্ড)কোরআনে নাম ধরে ডাকার নির্দেশনাআল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং সেই নামগুলো দিয়েই তাঁকে ডাকো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮০)মানে আল্লাহর নাম নিয়ে ডাকতে তিনিই বলেছেন।

