বিজ্ঞানকে রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার করার পরিণতি হবে ভয়াবহ: কার্ল উনশ

জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে কার্ল উনশ এক অনন্য নাম। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটিতে ষাটের দশকের শেষ দিকে যখন তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন শ্রেণিকক্ষের হিসাব-নিকাশ দিয়ে বিশাল সমুদ্রের রহস্য উন্মোচন করা ছিল দুরুহ কাজ। তাই তিনি সরাসরি সমুদ্রে নেমে পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের সিদ্ধান্ত নেন, যা তার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দেয়। বর্তমানে ৮৫ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানী আধুনিক ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। সমুদ্রের তাপমাত্রা শোষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মেরু অঞ্চলের বরফ গলার মতো জটিল বিষয়গুলো নির্ভুলভাবে পরিমাপের পদ্ধতি তৈরির জন্য তিনি ২০২৬ সালে বিবিভিএ ফাউন্ডেশনের মর্যাদাপূর্ণ ‘ফ্রন্টিয়ার্স অব নলেজ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।

সম্প্রতি ২৩ আগস্ট স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এল পাইস’-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে কার্ল উনশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সেলভা ভার্গাস রেয়াতেগির নেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিজ্ঞানকে রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার করার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তার মতে, সমুদ্রকে বুঝতে হলে পুরো পৃথিবীকে একটি একক ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট একটি দেশের কাজ নয়, বরং বিশ্বের সব বিজ্ঞানীদের যৌথ দায়িত্ব।

বিজ্ঞানী উনশ জানান, গত ৩০ বছরে সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। একসময় কেবল গবেষণাজাহাজের ওপর নির্ভর করতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত ধীরগতির ও ব্যয়বহুল। একটিমাত্র জাহাজ দিয়ে সমুদ্রের বিশালতার খুব সামান্য অংশই জানা সম্ভব ছিল। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে এখন কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে প্রায় পুরো সমুদ্রপৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় বিভিন্ন যন্ত্র সমুদ্রে মাসের পর মাস তথ্য সংগ্রহ করছে এবং বিভিন্ন দেশ তাদের জাহাজ ও গবেষণালব্ধ তথ্য পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। এর ফলে সমুদ্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়েছে।

আগের দিনে ধারণা করা হতো সমুদ্রের গভীর অংশ বেশ শান্ত ও ধীরগতির, যেখানে ওপরে উষ্ণ পানি এবং নিচে ঠান্ডা পানি থাকে। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে সমুদ্র অত্যন্ত জটিল ও অস্থির। এর পৃষ্ঠ থেকে শুরু করে গভীর তলদেশ পর্যন্ত সর্বত্র প্রবল ঘূর্ণি ও স্রোতের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে চলেছে। নিজের প্রথম সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে উনশ জানান, ম্যাসাচুসেটসের উডস হোল থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রাটি ছিল ভয়াবহ ঝড়ের মুখোমুখি। প্রচণ্ড সমুদ্রপীড়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রথমে আর কখনো সমুদ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে শান্ত সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানচর্চার যে আনন্দ তিনি পেয়েছিলেন, তা ল্যাবরেটরি বা কম্পিউটারের কাজের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

গবেষণার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাহাজ নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনের কাদিজে পৌঁছাতে তাদের প্রায় এক মাস সময় লেগেছিল। তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে, একটি পরিবর্তনশীল ব্যবস্থাকে স্থির চিত্রের মতো করে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে, কারণ এক মাস পর সেই সমুদ্রের অবস্থা আর আগের মতো থাকে না। উনশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, জলবায়ু ও সমুদ্র বৈশ্বিক সম্পদ হওয়ায় একে কোনো একক দেশের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বিভিন্ন দেশের যৌথ প্রচেষ্টায় কেউ যন্ত্র দিয়ে, কেউ কম্পিউটার মডেল বানিয়ে আবার কেউ অভিযান চালিয়ে এই গবেষণাকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন এই সমুদ্রবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ট্রাম্পের প্রভাব বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে এক প্রজন্মের গবেষকরা প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থায়ন পাচ্ছেন না, অনেকে চাকরি হারাচ্ছেন এবং বিজ্ঞানীদের গবেষণাকে ‘ভাঁওতা’ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ কার্বন ডাই-অক্সাইড যে পৃথিবীকে উষ্ণ করছে, তা শত বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রমাণিত সত্য। বিশ্বজুড়ে চলমান চরম আবহাওয়ার বিপর্যয়গুলো বিজ্ঞানীদের বহু দশক আগের সতর্কবার্তারই বাস্তব প্রতিফলন।

বিজ্ঞানীদের ভূমিকা সম্পর্কে কার্ল উনশ বলেন, বিজ্ঞান কখনো শতভাগ নিশ্চিত করে কথা বলে না, বরং সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাস্তব হলেও ঠিক কোন সময়ে কতটা পরিবর্তন আসবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। এই অনিশ্চয়তার কারণেই সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা তৈরি হয়। তিনি দাবানলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, কখন কোথায় আগুন লাগবে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও ঝুঁকি যে বাড়ছে তা জানা ছিল এবং প্রস্তুতির অভাবই বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই বিজ্ঞানীদের কাজ হলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং সমাজকে সচেতন ও প্রস্তুত করা। কারণ সমুদ্রের পরিবর্তন কেবল সমুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং সমগ্র মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ।

কার্ল উনশ: সমুদ্রবিজ্ঞানের প্রতি প্রথম আকর্ষণই ছিল সমুদ্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা। পরে ২০-৩০ জনের দল নিয়ে গবেষণা অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাই। সেটি ছিল আরও উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

আগামীকালকের সমুদ্র আজকের মতোই থাকবে। কিন্তু ১০ বছর পর সমুদ্র বদলে যাবে। ৫০ বা ১০০ বছর পর আরও বেশি বদলাবে। কিন্তু ঠিক কীভাবে বদলাবে, তার সবটা আমরা জানি না। কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়তে থাকলে সমুদ্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটিও পুরোপুরি জানা নেই।