শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি ও হয়রানি রোধে তদন্ত কমিটির তৎপরতা

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম। সৌদি প্রবাসী মনির হোসেন দীর্ঘ ছয় বছর প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরের বেল্টে লাগেজ হাতে নিয়ে তিনি দেখেন ব্যাগ কাটা, চেইন খোলা এবং মালামাল উধাও। মনিরের মতো এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য প্রবাসী। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ নিয়ে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা এই সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বাংলাদেশ বিমানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩৮৭টি অভিযোগ জমা পড়লেও ১ হাজার ৩৭২টি নিষ্পত্তির দাবি করা হলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫টি ক্ষেত্রে। ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে জমা পড়া ৯২২টি অভিযোগের মধ্যে ৯১৪টি নিষ্পত্তির দাবি করা হলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এই অনিয়ম ও জবাবদিহির সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন (রাসেল)। আদালতের নির্দেশে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ১০ আগস্ট ১১ সদস্যের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির আহ্বায়ক ও বেবিচকের সদস্য এস এম লাবলুর রহমানের নেতৃত্বে ৩০ আগস্ট দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী রোববার সকাল ১০টায় কমিটির সদস্যরা বিমানবন্দরে গিয়ে লাগেজ গ্রহণ, বাছাই, পরিবহণ, লোডিং-আনলোডিং ও ডেলিভারি প্রক্রিয়া সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করবেন।

তদন্ত কমিটির নথিতে উঠে এসেছে যে, অসাধু কর্মীরা কৌশলে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে নিয়ে গিয়ে লাগেজ থেকে মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেয়। এছাড়া তদন্ত কমিটির নথিতে ঝুঁকিপূর্ণ মালামাল নিয়েও অভিযোগের হিসাব এসেছে। এ ধরনের ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৩টি নিষ্পত্তি এবং আটটি ক্ষেত্রে পেমেন্ট বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। যদিও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের ওপর নজরদারিতে বডি ক্যামেরা চালু করা হয়েছে, তবুও অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কমিটি বডি ক্যামেরা ব্যবহারের আগের ও পরের পরিসংখ্যান যাচাই করতে চায়। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাধারণ সম্পাদক ও কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর জানান, শুধু মিটিং করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, সরেজমিন পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, অভিযোগের ফাইল বন্ধ করাই নিষ্পত্তি নয়। তিনি স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, হাজার হাজার অভিযোগের বিপরীতে হাতেগোনা ক্ষতিপূরণ পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। এদিকে, অনিয়ম ও মূল্যবান লাগেজ ছুড়ে ফেলার ঘটনায় ইউএস-বাংলার ২ জন এবং বিমান বাংলাদেশের ১ জনসহ মোট ৩ কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি বিগত বছরগুলোতে এ ধরনের ঘটনায় নেওয়া ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি নজরদারির বাইরে লাগেজ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।