ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যকে মানব জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের অধিকার রক্ষা এবং বাজারে একটি সুষম ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ইসলাম নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই কল্যাণকর নিয়মগুলো মেনে চলার মাধ্যমেই কেবল উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব। ব্যবসায়িক লেনদেনে নীতি ও নৈতিকতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কারণ নৈতিকতাহীন ব্যবসায় সহজেই অবৈধ বা হারাম উপার্জনের অনুপ্রবেশ ঘটে।
কোরআন ও হাদিসে হারাম উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। মুসনাদে আবি ইয়ালায় বর্ণিত একটি হাদিসে (হাদিস নম্বর: ৭৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'সেই দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যাকে তৃপ্ত করা হয়েছে হারাম দ্বারা।' তাই প্রতিটি মুসলমানের জন্য ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট বর্জনীয় বিষয় কঠোরভাবে পরিহার করা আবশ্যক।
প্রথমত, কেনাবেচার ক্ষেত্রে পণ্যটি শরিয়তসম্মতভাবে বৈধ হওয়া আবশ্যক। মদ কিংবা শূকরের মতো যেকোনো ধরনের হারাম বস্তু কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ। দ্বিতীয়ত, পণ্য কেনাবেচার সময় দالاলি বা কৃত্রিম দরদাম করার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা যাবে না। এখানে দالاলি বলতে বোঝায়, কোনো ব্যক্তির নিজের পণ্য কেনার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও কেবল ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত দাম হাঁকানো। এর ফলে প্রকৃত ক্রেতা বা বিক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং তৃতীয় কোনো পক্ষ অন্যায়ভাবে লাভবান হয়। বুখারি শরিফের ২১৪০ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) এ ধরনের নীতিহীন কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, 'এক মুসলমান যেন অপর মুসলমানের ওপর গিয়ে পণ্যের দাম না বলে এবং বিয়ের আলোচনা চলা অবস্থায় প্রস্তাব না দেয়।'
এ ছাড়া ব্যবসায়িক লেনদেনে যেকোনো ধরনের সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে দূরে থাকা জরুরি। যেমন, কোনো বৈধ পণ্য যদি এমন কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়, যার ব্যাপারে পণ্যটির অপব্যবহার করার আশঙ্কা থাকে, তবে তা পরিহার করা উচিত। বুখারি শরিফের ১৪৮২ নম্বর হাদিসে এ জাতীয় সন্দেহজনক লেনদেনের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আরেকটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বর্জনীয় বিষয় হলো সুদের মতো হারাম লেনদেনে জড়িয়ে পড়া। সুদ একটি সুস্পষ্ট হারাম কাজ, যা ব্যবসার সব বরকত কেড়ে নেয়। অন্যান্য গুনাহের শাস্তি সাধারণত পরকালে নির্ধারিত থাকলেও সুদের ভয়াবহতা এত বেশি যে, আল্লাহ তায়ালা সুদখোরদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। এমনকি সুদি কারবারে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। সুরা বাকারার ২৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন। আর দান-সদকাকে বৃদ্ধি করেন।'
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অজান্তেই সুদের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে এমন কয়েকটি প্রচলিত ক্ষেত্র রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— গবাদিপশু প্রতিপালনের বহুল প্রচলিত কিছু পদ্ধতি, জমি বন্ধক রাখার প্রচলিত নিয়ম এবং ইসলামি ব্যাংক, সমবায় সমিতি বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ গ্রহণের সময় যথাযথ শরিয়া স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ না করা। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) সূত্রে তিরমিজি শরিফের ১২০৬ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, এর সাক্ষী এবং সুদের হিসাব-নিকাশ বা চুক্তিপত্র লিখে দেওয়া ব্যক্তি—সবার প্রতি অভিশাপ করেছেন। তাই দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি মুসলমানের উচিত ব্যবসায় সুদের সংমিশ্রণ থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা।
১. গবাদিপশু প্রতিপালনের জন্য বহুল প্রচলিত পদ্ধতি।
২. জমি বন্ধক দেওয়ার বহুল প্রচলিত পদ্ধতি।

