প্রায় ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে আবার ভোট হতে যাচ্ছে। সংখ্যার হিসাবে ফলাফল অনেকটাই জানা—জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপির প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত। তারপরও বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছে। এই প্রার্থিতা তাই শুধু ভোটের লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশল। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, যাঁকে প্রার্থী করেছিল আওয়ামী লীগ। আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হয়েছিলেন। সেই নির্বাচন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য, নিরপেক্ষতা এবং সরকার-বিরোধী দলের সম্পর্ক নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি করেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে আছে। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। প্রতিবারই একক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, ফলে সংসদকক্ষে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি।
এবারের পরিস্থিতি তাই ১৯৯১ সালের পর সংসদে ভোটের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুসারে, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হবে। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপরও একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট হবে ২০ আগস্ট। বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। অন্যদিকে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এবং তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্রও তোলা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনপদ্ধতিতে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে প্রত্যক্ষ নির্বাচনপদ্ধতি চালু করা হয়। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালে দুবার সাধারণ ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটে ভোটার শুধু সংসদ সদস্যরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন এবং সংসদকক্ষে ভোট গ্রহণ হবে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৪০টি পায়, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১ আসনের চেয়ে ১১টি কম ছিল। আওয়ামী লীগ পায় ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন। বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের আয়োজন করা হয়। বিএনপি প্রার্থী করে তৎকালীন স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাসকে। তিনি ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় সদস্য ছিলেন এবং জিয়াউর রহমানের সরকারের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী ও বিচারপতি আবদুস সাত্তার সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বিএনপি নেতা।
বিএনপি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে প্রার্থী করায় আওয়ামী লীগসহ কিছু বিরোধী দল তাঁর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার বিষয়টি সামনে আনে এবং একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার দাবি জানায়। বিএনপি অনড় থাকায় আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দুটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছিল—প্রথমত, দলীয় রাজনীতিকের পরিবর্তে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে চাওয়া এবং দ্বিতীয়ত, বিএনপির ভেতরে মুক্তিযুদ্ধপন্থী সংসদ সদস্যদের ভোট টানার সুযোগ তৈরি করা।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের আয়োজন করা হয়। বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস পান ১৭২ ভোট, যা প্রয়োজনীয় ১৬৬ ভোটের চেয়ে মাত্র ছয় ভোট বেশি। ওই সংসদে সংরক্ষিত আসনসহ বিএনপির মোট আসন ছিল ১৬৮টি। বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর পক্ষে ভোট পড়ে ৯২টি। সংরক্ষিত নারীসহ সংসদে মোট ৩৩০ সদস্যের ভোটের ব্যবস্থা থাকলেও সব মিলিয়ে ভোট পড়ে ২৬৪টি, অর্থাৎ ৬৬ জন ভোট দেননি। আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু বিপুল রাজনৈতিক ঐকমত্য নিয়ে নয়। রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ জামায়াতের ভোট পেতে তৎপর ছিল এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভোট চেয়েছিলেন। আবদুর রহমান বিশ্বাসও গোলাম আযমের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। দৈনিক সংবাদ ৮ অক্টোবর ‘নিন্দনীয়’ শিরোনামে এ নিয়ে বিশেষ লেখা ছেপেছিল। এছাড়া জামায়াত সরকার গঠনে বিএনপিকে সহায়তা করলেও রাষ্ট্রপতি পদে জামায়াতের সবাই আবদুর রহমান বিশ্বাসকে ভোট দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর সংসদ স্থায়ী ছিল ১১ দিন। ওই বছর জুনে অনুষ্ঠিত পরের নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে। বিরোধী দল কাউকে প্রার্থী করেনি। এরপর প্রতিবারই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে, কিন্তু বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে বিএনপি। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও নিজেই নিয়েছিলেন। একপর্যায়ে এক-এগারোর সরকার দায়িত্ব নেয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং জিল্লুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। তিনি ২০১৩ সালে মারা গেলে মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আবদুল হামিদ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল স্বাভাবিক অবসরে যান। তিনি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বাধিক সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি। এরপর ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন, যিনি গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন।
সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রধান এবং সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তিনি দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ডাদেশ স্থগিত, হ্রাস বা ক্ষমা করতে পারেন। প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের পর এবং বছরের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। সংসদে পাস হওয়া প্রতিটি বিল আইনে পরিণত হয় রাষ্ট্রপতির সম্মতি প্রদানের পর। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ কার্যভার গ্রহণের সময় থেকে পাঁচ বছর। সংবিধান অনুযায়ী ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে দুজন সংসদ সদস্য থাকতে হবে। সংসদকক্ষে নির্বাচনী কর্মকর্তার সামনে নির্ধারিত ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নাম ও স্বাক্ষর দিয়ে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি মাত্র ভোট থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে ভোট গণনা করবেন। সর্বাধিক সংখ্যক ভোটপ্রাপ্তকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করা হবে।

