রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন: রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা নাকি উত্তরণ?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলো রাষ্ট্রপতি। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই মূলত নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ন্যস্ত থাকে এবং তিনি দেশ পরিচালনা করেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান বা অভিভাবক, যিনি সমগ্র জাতির ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হলো: একজন সক্রিয়, রাজপথের পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ যখন রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন, তখন কি তার রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে? তিনি কি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যান? তার কি আর দেশের নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে না?

সামপ্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি নতুন করে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব এবং বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় ১৬ বছর ধরে দলের অন্যতম শীর্ষ পদে থেকে যিনি রাজপথের আন্দোলন, কারাবরণ এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় নিরলসভাবে সক্রিয় ছিলেন, তার বঙ্গভবনে যাওয়ার অর্থ কি একজন রাজনৈতিক যোদ্ধার চিরতরে নীরব হয়ে যাওয়া? এই কাঠামোগত রূপান্তর কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র পরিচালনার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য?

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, কার্যাবলি ও দায়বদ্ধতার রূপরেখা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও, পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যদিয়ে এই ব্যবস্থার রদবদল ঘটে। অবশেষে ১৯৯১ সালে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে থাকে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার হাতে। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান এবং তিনি অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী কাজ, চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তার নামেই সম্পন্ন হয়। তবে সংবিধানের ৪৮(৩) ও ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন। বাকি সব দায়িত্ব পালনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মানতে বাধ্য। এমনকি প্রধানমন্ত্রী আসলেই পরামর্শ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলেও সংবিধানে আইনি রক্ষাকবচ রয়েছে।

সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন এবং দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারেন না। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের দায়ে সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে তাকে অভিশংসন করার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদটিকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য সংবিধানে সুস্পষ্ট রক্ষাকবচ যুক্ত করা হয়েছে। কার্যভার গ্রহণের দিন থেকেই তাকে সংসদ সদস্যপদসহ দলীয় সকল পদ ছাড়তে হয়, যাতে তিনি দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের আস্থাভাজন অভিভাবক হতে পারেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির চেয়ার কখনোই সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল না। স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মনোমালিন্য তৈরি হয় এবং তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৪শে জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৭৮ সালের ৩রা জুলাই দেশে প্রথম সরাসরি ভোটাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। তার মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের নির্বাচনে ৩৯ জন প্রার্থীর মধ্যে বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। সেই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে এবং স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করলেও আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়লাভ করেন। তিনি ১৯৯৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার অসামান্য প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে, যিনি নিরপেক্ষতার অনন্য উদাহরণ ছিলেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মো. সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে মো. সাহাবুদ্দিনের সাংবিধানিক ও নৈতিক অবস্থান সংকটে পড়ে। তিনি শেখ হাসিনাকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেওয়া এবং তার পদত্যাগপত্র নেই বলে বিতর্কিত মন্তব্য করে জনরোষের শিকার হন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪শে জুলাই তিনি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। সংবিধান অনুসারে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।

১৩ই আগস্ট ২০২৬ তারিখে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপস্থিতিতে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মির্জা ফখরুল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন। ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সাল থেকে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মির্জা ফখরুল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নিপীড়নের মুখে ছয়বার কারাবরণ করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর তাকে মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে মন্ত্রিসভা ও সংসদীয় আসন থেকেও পদত্যাগ করতে হবে।

প্রায় ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। তবে বর্তমান সংসদে বিএনপি’র নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের জয় গাণিতিকভাবে নিশ্চিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং ‘নির্দলীয়’ বা ‘সুপরা-পার্টিজান’ অবস্থানে উত্তরণ। একজন রাজনীতিবিদ যখন রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন, তখন তিনি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো জাতির অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই রাষ্ট্রপতির পদটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক পরিশীলিত ও নিরপেক্ষ পর্যায়। রাষ্ট্রপতি হওয়া মানে ক্যারিয়ারের মৃত্যু নয়, বরং সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে কাজ করার সুযোগ।