সাইবার অপরাধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যার ফলে সাইবার হামলার ঝুঁকি নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সফোসের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্যাকাররা সম্পূর্ণ নতুন কোনো কৌশল তৈরির চেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিগুলোকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও সুসংগঠিত করতে এআই ব্যবহার করছে। এর ফলে আগে যে হামলা চালাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগত, তা এখন মাত্র কয়েক দিনেই সম্পন্ন হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এআই সিকিউরিটি ২০২৬ রিপোর্ট’-এ এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে সফোস। প্রতিষ্ঠানটির চিফ টেকনোলজি অফিসার জন পিটারসন জানান, অতীতে কোনো প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ, নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়া এবং তথ্য চুরির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হ্যাকারদের বেশ সময় ব্যয় করতে হতো। তবে এআই প্রযুক্তির কল্যাণে এখন এই পুরো প্রক্রিয়ার গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে সাইবার হামলা শনাক্ত এবং তা প্রতিরোধ করার জন্য নিরাপত্তা দলগুলোর হাতে আগের চেয়ে অনেক কম সময় থাকছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এআইয়ের ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে এন্টারপ্রাইজ এআই আইডেন্টিটি, ওঅথ (OAuth) টোকেন, এআই এজেন্ট, এপিআই এবং ডেভেলপমেন্ট টুলগুলো হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। একই সাথে ডিপফেক প্রযুক্তি এবং এআই-সহায়িত সামাজিক প্রকৌশল (সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। হ্যাকাররা এখন আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, জেলব্রেকিং, ম্যালওয়্যার তৈরি এবং অপরাধমূলক সেবাগুলোতেও এআই যুক্ত করছে। এমনকি এআই ডেভেলপমেন্টের অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থাও এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি।
সফোসের গবেষকেরা সম্প্রতি ‘এসটিএসি৬৯৯৪’ (STAC6994) নামে একটি বিশেষ সাইবার হামলা অভিযান শনাক্ত করেছেন। এই অভিযানে হ্যাকাররা একটি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের ভেতরেই নিজস্ব সফটওয়্যার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। তারা প্রায় ১২টি এআই এজেন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখে। এই সময় তারা প্রায় ৮০টি মডিউল এবং ৭০টিরও বেশি নিরাপত্তা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল তৈরি করতে সক্ষম হয়। মানুষের পক্ষে যে কাজ করতে কয়েক সপ্তাহ লাগত, এআইয়ের সাহায্যে হ্যাকাররা তা মাত্র কয়েক দিনেই সম্পন্ন করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোডিং এজেন্ট, এআই সহকারী ও উন্মুক্ত ওজনের (ওপেন ওয়েট) মডেলগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। ফলে এসব সিস্টেমের পরিচয়পত্র, ওঅথ সংযোগ এবং এপিআই কী হ্যাকারদের জন্য সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। এআই-চালিত সামাজিক প্রকৌশল এবং ডিপফেক প্রতারণাকে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও কম ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা বড় পরিসরে পরিচালনা করা সম্ভব। এছাড়া ভুয়া এআই বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম, ডেভেলপার টুল, ক্রেডেনশিয়াল, মডেল ওয়েট এবং এমসিপি সার্ভারও এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সফোসের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল এআই মডেলের সুরক্ষাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি আইডেন্টিটি বা পরিচয় ব্যবস্থাপনা, শাসনব্যবস্থা এবং সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তাকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। উল্লেখ্য, সফোস এক্স-অপস এমডিআর কেসওয়ার্ক, সফোস ল্যাবসের বিশ্লেষণ, সফোস সিটিইউ ইন্টেলিজেন্স, সফোস এআই রিসার্চ এবং বিশ্বজুড়ে ৬ লাখ ২৫ হাজারের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

