নিয়োগ-বদলি সিন্ডিকেট: ‘মাফিয়া মাইকেল’ গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

নিবন্ধন পরিদপ্তর বা সাব-রেজিস্ট্রারদের নিয়োগ ও বদলির নাম শুনলেই এখন যে নামটি সবার সামনে আসে, তিনি হলেন মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। ‘বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিআরএসএ)-এর মহাসচিবের পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। বিগত সরকার থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার— ক্ষমতার পালাবদল হলেও বদলায়নি মাইকেলের ক্ষমতার দাপট। বদলি বাণিজ্য আর দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি গড়েছেন বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পাহাড়। পরিচিত মহলে তিনি ‘মাফিয়া মাইকেল’ নামে পরিচিত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২৯তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান মাইকেল মহিউদ্দিন। তৎকালীন প্রভাবশালীদের আশীর্বাদে তিনি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সেক্টরের ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’ হয়ে ওঠেন। কারাবন্দি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সারা দেশের লোভনীয় চেয়ারগুলোর নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট-পরিবর্তনের পরও মাইকেলের প্রভাব একটুও কমেনি। এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ২৮৬ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়, যার বড় অংশই হয়েছে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে। এই নিয়োগ বাণিজ্যেও মাইকেলের বড় হাত রয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যখন নিবন্ধন কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে ১০ দিনের সময় বেঁধে দেন, তখন প্রশাসনে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। কিন্তু এই নির্দেশকে পাশ কাটাতে গত বছরের ২৭ আগস্ট সচিবালয়ে এক নাটকীয় বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিক্ষোভের আড়ালে সিন্ডিকেটটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুকৌশলে সমঝোতা করে নেয়। বিআরএসএর ২০২৫-২০২৬ মেয়াদের কমিটির অনেক সদস্য নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে নিয়ম ভেঙে সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে চিহ্নিত হওয়ার পরও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দপ্তরে বহাল রয়েছেন মাইকেল।

মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীর গুলশানের নামি-দামি রেস্তোরাঁ ছিল মাইকেল সিন্ডিকেটের ‘তদবির’ করার প্রধান কেন্দ্র। কমিটির যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর আলম বা সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেনদের মতো ব্যক্তিরা নিয়ম ভেঙে ঢাকার আশপাশে লোভনীয় চেয়ার পেয়েছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাইকেলের কমিটির সব সদস্যই নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর তো দূরের কথা, এক মাসের মাথায়ই নতুন পদায়ন নিতে দেখা যায়। বদলির পরে জায়গা ধরে রাখতে নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয় তাঁকে। যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোস্তফা চুয়াডাঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়, জাহাঙ্গীর আলম শেরপুর থেকে বাড্ডায়, সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বাবর মিরোজ মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে কেরানিগঞ্জ এবং আব্দুল বাতেন নবাবগঞ্জ থেকে গাজীপুর সদরের সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন নিয়েছেন।

মাইকেলের ‘রাজত্ব’ রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে বিস্তৃত। ঢাকার আফতাব নগরেই মাইকেলের মালিকানাধীন বিলাসবহুল ভবনে অন্তত ২৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে। গুলশান-১ এর ৭ নং রোডের ৭ নং কোহিনুর টাওয়ারে তার বর্তমান আবাসস্থল। এছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্লক-এ ২৭ নম্বর বাড়ি, গুলশান সার্কেল ১-এর প্লট ৩৭, ৩৯, ৪১ এবং ব্লক ই-এর ৬ নম্বর রোডের ৩০১/এ ১০ কাঠার প্লটটি তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের নামে কেনা। গুলশান-১ এর ৭ নম্বর রোডের ৩ নম্বর শখিনা নামের বাড়িতে ২৫০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার প্রতিটির মূল্য কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা। এছাড়া গুলশান-১ এর ৪ নম্বর সড়কের ৪বি, স্টার সেন্টারে বাণিজ্যিক স্পেস, পূর্বাচল মডেল টাউনের মা মহল, সেক্টর ১১৩ এর রোড ১০৬-এর প্লটটি তার শ্যালকের নামে। গুলশান-১-এর ৩৩ নম্বর রোডের ৬ নম্বর হাউসে ১০ কোটি টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট, নর্থ এভিনিউ গুলশানে ৩টি ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ চলমান এবং লেক সার্কেলে ১২ কোটির বেশি মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তার স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে রয়েছে প্লট ১৪৩, ব্লক এইচ-এর পুরো প্লট। নিকেতন এ/১৩৩-এ ১৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং হাতিরঝিলের কাছে শ্যালকের নামে ১৫৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাদেকপুর গ্রামে ইটের ভাটা, রূপগঞ্জ নারায়ণগঞ্জের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে ব্লক ডিতে ৫ কাঠার দুটি প্লট, ব্লক এ-তে ১০ কাঠার প্লট যা তার বোনের নামে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। বড় মগবাজারের ৭০৪/১ নম্বর বাড়িতে ফ্ল্যাট, পান্থপথের কাঁঠালবাগানের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ২৪/সিতে দুটি ফ্লোর, বনশ্রীর জে ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়ির বি ইউনিটে ভাতিজার নামে ফ্ল্যাট এবং হোসাইন মঞ্জিলের ৫ম তলায় বোনের স্বামীর নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরেও মাইকেল গড়েছেন সম্পদের পর্বত। সেখানে প্রায় ১০০ বিঘা কৃষিজমি, একাধিক মাছের ঘের ও ইটের ভাটা রয়েছে। এছাড়া রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এবং পূর্বাচলেও তার কয়েক বিঘার প্লট রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের বোন আসমাউল হুসনা লিজার বিসিএস ক্যাডারে নিয়োগ এবং পোস্টিং নিশ্চিত করতেও তিনি অর্থের প্রভাব খাটিয়েছেন।

গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফসান আল আলভী দুদকে ‘শত কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের’ বিস্তারিত তথ্য দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। দুদক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক অভিযোগ পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর কোনো বাড়ি-গাড়ি বা সম্পদ নেই, তিনি ভাড়া বাড়ি ও ভাড়া গাড়ি নিয়ে চলেন। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাথে তাঁর কোনো যোগাযোগ বা আত্মীয়তা নেই বলেও তিনি দাবি করেন। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিগত সময়ে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে যে অনিয়ম জমেছে, তা খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।