ইসলাম মানুষকে সম্পদ কুক্ষিগত করে না রেখে উদারচিত্তে অভাবীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে উৎসাহিত করে। আর্তমানবতার সেবায় গরিব-দুঃখী ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। সম্পদ সঞ্চয়ের নেশা এবং দারিদ্র্যের ভয় শয়তানের কুমন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নয়। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২৬৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট করেছেন যে, শয়তান মানুষকে দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে অশ্লীলতার আদেশ দেয়, অথচ আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ ও মাগফিরাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক বিত্তশালী মুসলমান তাদের অর্থ-সম্পদ এমন সব ব্যাংকে জমা রাখেন, যা সুদের মাধ্যমে গরিব রাষ্ট্র ও মানুষের ওপর শোষণ চালায়। মানবতার ফেরিওয়ালার মুখোশধারী এই মহাজনদের সুদের কিস্তি মেটাতে গিয়ে বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে পাহাড় সমান সম্পদ জমানোর চেয়ে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসাই শ্রেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'দ্বীন মানেই কল্যাণকামিতা' (মুসলিম : ১০০)।
ইসলামের সূচনালগ্নে মদিনার আনসার সাহাবিরা মুহাজির ভাইদের প্রতি যে সহমর্মিতা ও ত্যাগের নজির স্থাপন করেছিলেন, তা ইতিহাসের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। নিজেরা চরম অভাবের মধ্যেও তারা মুহাজিরদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাদের এই ত্যাগের প্রশংসা করে বলেছেন, যারা স্বভাবগত কার্পণ্য থেকে মুক্তি পায়, তারাই সফলকাম। একইভাবে সুরা দাহরের ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা নিজেরা খাবারের প্রতি আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দীদের খাবার দান করে, তারাই জান্নাতের নেয়ামত লাভ করবে।
দানের ক্ষেত্রে ইসলাম উৎকৃষ্ট ও প্রিয় বস্তু দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। অনেকে অকেজো বা উদ্বৃত্ত বস্তু দান করে তৃপ্তি পায়, কিন্তু কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, প্রিয় বস্তু ব্যয় না করা পর্যন্ত পূর্ণ সওয়াব লাভ করা সম্ভব নয়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম তাদের প্রিয় সম্পদ আল্লাহর পথে দান করতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। সাহাবি আবু তালহা (রা.) তার সবচেয়ে প্রিয় 'বায়রুহা' নামক খেজুর বাগানটি আল্লাহর নামে সদকা করে দিয়েছিলেন, যা রাসুল (সা.)-এর পরামর্শে তিনি আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করে দেন (বোখারি : ১৪৬১)। তবে দানের ক্ষেত্রে সব সময় নষ্ট, বিকৃত ও অকেজো বস্তু ব্যয় করার রীতি অবলম্বন করা মাকরুহ ও নিষিদ্ধ। কিন্তু যে ব্যক্তি প্রিয় বস্তুও ব্যয় করে এবং মাঝে মধ্যে প্রয়োজনাতিরিক্ত বস্তু যেমন উদ্বৃত্ত খাদ্য, পুরনো পোশাক, ত্রুটিযুক্ত পাত্র এবং ব্যবহৃত পণ্যও দান করে, সেও অবশ্যই সওয়াবের অধিকারী হবে। সেই সঙ্গে আয়াতের শেষাংশে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, মানুষ যা ব্যয় করে, তার আসল স্বরূপ আল্লাহর অজানা নয়। সুখ্যাতি ও লোক দেখানো মনোভাব পরিহার করে তার সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে সাধ্যমতো ভালো উত্তম বস্তু দান করাই কাম্য। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন : ২/৯৩-৯৫)।
ইসলামের স্কলারদের মতে, দান-খয়রাতের সওয়াব পেতে হলে ভালো ও প্রিয় বস্তু দান করা বাঞ্ছনীয়। সুরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, নিজের উপার্জন থেকে উত্তম বস্তু ব্যয় করতে এবং বাজে জিনিসের নিয়ত না করতে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব সম্পদই দান করতে হবে; বরং সাধ্যমতো ভালো ও প্রিয় বস্তু দেখে দান করাই হলো মূল শিক্ষা। এমনকি খেজুরের মতো নগণ্য বস্তুও যদি খাঁটি মনে দান করা হয়, তবে তাতেও বিরাট সওয়াব রয়েছে। যাদের মূল্যবান সম্পদ নেই, তারাও জিকির, তেলাওয়াত ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে দানের মহাপুণ্য অর্জন করতে পারেন। পরিশেষে, লোক দেখানো মনোভাব পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করাই একজন মুমিনের কাম্য হওয়া উচিত।

