এসএসসির ফল প্রকাশে টালবাহানা: শিক্ষার্থীদের টেনশনে রেখে কার কী লাভ?

মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা ফল প্রকাশের ক্ষণগণনা শুরু করেন। সবার মনেই ঘুরপাক খায়—কবে পরীক্ষার ফল প্রকাশ হবে? এই অপেক্ষার মধ্যে যেমন উত্তেজনা থাকে, তেমনি থাকে কমবেশি উদ্বেগ। সাধারণত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের নিয়ম রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ ও শিক্ষা বোর্ডের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে এই সময়সূচি কয়েক দিন কমবেশি হতে পারে।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় ২১ এপ্রিল ২০২৬ এবং শেষ হয় ২০ মে। এটি জানার পর কোনো রকম বুজরুকি ছাড়াই শুধু হাতের কড় গুনে বলে দেওয়া সম্ভব—কবে ৬০ দিন পূর্ণ হবে। এর মধ্যে হঠাৎ গত ৮ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ডেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, ২০ জুলাই এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হবে। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯ জুলাই বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে যে ২০ জুলাই ফল প্রকাশিত হচ্ছে না। বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান শনিবার (১৯ জুলাই) প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি কেন ফলাফল প্রকাশ হচ্ছে না, সেটি স্পষ্ট না করলেও জুলাইয়ের মধ্যেই ফলাফল প্রকাশের জন্য তাঁরা প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছিলেন। এখন বলা হচ্ছে, জুলাই নয়, আগামী ১০ আগস্ট ফলাফল প্রকাশ করা হবে।

এই খবরের পর অনলাইনে নানা মন্তব্য দেখা যায়, যেখানে অনেকে এই পরিস্থিতিকে ‘আউলায় যাওয়া’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য অনলাইন মন্তব্যের ময়নাতদন্ত নয়, বরং শিক্ষার্থীদের টেনশন ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা নিয়ে আলোচনা করা। ২৬ জুলাই সিরাজগঞ্জ এলাকার যমুনার চরগুলোতে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপের সুযোগ হলে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তার রেখাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থীই আশঙ্কা করছে, এবার ফেলের হার বাড়বে। আজমেরি নামের এক শিক্ষার্থী জানায়, যখনই কেউ আজ নয় কাল বলে ঘোরায়, তখনই বোঝা যায় এর পেছনে কোনো মতলব আছে। একজন শিক্ষক মন্তব্য করেন, পারসেন্টেজের মামলা আছে। কতজনকে কত নম্বর গ্রেস দিয়ে পাস করালে সাপও মরবে, কিন্তু লাঠিও ভাঙবে না—সেই পথ খোঁজার জন্য সম্ভবত এই অঙ্ক-কষাকষি চলছে।

আগের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে ছাত্রবান্ধব প্রমাণ করার জন্য নানা উপায়ে পাসের হার বাড়ানোর অভিযোগ ছিল। গত ১০ বছরের গড় পাসের হার ছিল ৮২.১৭ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল ২০২১ সালে ৯৩.৫৮ শতাংশ (কোভিড-১৯ মহামারির বিশেষ মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রভাব) এবং সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল ২০২৫ সালে ৬৮.৪৫ শতাংশ, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩.০৪ শতাংশ, কিন্তু ২০২৫ সালে তা প্রায় ১৪.৬ শতাংশ কমে যায়। পাসের হার বাড়লে মিষ্টিজাতীয় খাদ্যপণ্যের বিক্রি বা কোচিং সেন্টারের বকেয়া আদায়ের মতো অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে, আবার কলেজগুলোতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ঢল নামে।

এদিকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক ইন্টারনেটে খুঁজছেন—‘এসএসসি ২০২৬-এর ফল কবে প্রকাশ হবে?’ এই অপেক্ষা দিন যত দীর্ঘ হচ্ছে, উৎকণ্ঠাও তত বাড়ছে। তথাকথিত ‘নরম করে খাতা দেখা’ পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়ানো যেমন অনুচিত, তেমনি শিক্ষার মান বেড়েছে—এটি প্রমাণের জন্য অপ্রয়োজনীয় কঠিন প্রশ্ন করে বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি করে খাতা মূল্যায়নের মধ্যেও কোনো সাফল্য নেই।

কথা বলে জানা গেল, চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে অনেক শিক্ষার্থীর। শামিমা আখতারকে তার পরিবার আগেই জানিয়ে দিয়েছে, ফেল করলে আর পড়াশোনা নয়—বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিল বলেই এত দিন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছে। একই অবস্থা কাশেম আলীর। ফলাফলই ঠিক করে দেবে তাঁর ভবিষ্যৎ। ফেল করলে তাকে নরসিংদীর একটি রি-রোলিং মিলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় এবং বলে, ‘মরে গেলেও আমি নরসিংদী যাব না।’

রংপুরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জানান, গত বছর ১০ জুলাই এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরের তিন দিনে অন্তত ১৬ জনের আত্মহত্যার খবর পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে ফলাফল প্রকাশের প্রথম চার ঘণ্টার মধ্যেই আত্মহত্যা করেছিল ৯ জন; তাঁদের প্রায় সবাই ছিল শিক্ষার্থী এবং অধিকাংশই মেয়ে। ২০১৮ সালে লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষণায় দেখা যায়, যেসব কিশোর-কিশোরী অবহেলা, কটূক্তি, পারিবারিক সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হয়, তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আমাদের দেশেও পরীক্ষায় খারাপ করা শিক্ষার্থীদের অনেককে অভিভাবক, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, এমনকি ‘সফল’ সহপাঠীদের অবহেলা ও মানসিক নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেকে দীর্ঘদিন চিন্তাভাবনা করে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ক্ষেত্রে আগাম কিছু ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব। যেমন—আত্মহত্যা বা মৃত্যু নিয়ে বারবার কথা বলা, নিজের চেহারা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীন হওয়া, বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, নিজের প্রিয় জিনিস অন্যকে দিয়ে দেওয়া, স্কুল বা খেলাধুলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, মনমরা থাকা বা হঠাৎ অস্বাভাবিক উৎফুল্ল আচরণ করা। তবে এসব লক্ষণের একটিও না থাকলেও কোনো শিশু বা কিশোর মানসিক চাপে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই পরিবারের সদস্য, শিক্ষক ও ঘনিষ্ঠজনদের দায়িত্ব হবে তাদের পাশে থাকা, আন্তরিকভাবে কথা বলা এবং একা থাকতে না দেওয়া। একই সঙ্গে ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বা অপমানজনক তুলনা থেকেও বিরত থাকতে হবে। শিশু-কিশোরদের মনে এই বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে—পরীক্ষায় পাস বা ফেল জীবনের শেষ কথা নয়; জীবনের মূল্য তার চেয়ে অনেক বড়।