পশ্চিম তীরে গত কয়েক দিন ধরে চলা সহিংসতার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ, ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর প্রাণঘাতী অভিযানের ঘটনাগুলো এখন একটি চেনা ছকে বাঁধা। সাম্প্রতিক এই অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল উত্তর পশ্চিম তীরের তাল গ্রামে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের মুখে দুই ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিহত হন। এই ঘটনার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি ফাঁড়ি ও বসতি সম্প্রসারণ এখন ইসরায়েলের নিরাপত্তার একটি কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কথা শুনলে মনে হতে পারে পশ্চিম তীরে তাঁদের সামরিক অভিযান ও বসতি স্থাপন কেবলই একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটি প্রতিক্রিয়া নয়, এটি তাঁদের বসতি স্থাপনের এক গভীর কৌশল—উপনিবেশায়নের কৌশল। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতির অজুহাত দেওয়া হতো সেখানে বসবাসকারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষার কথা বলে। গত পাঁচ বছরে একজন সেনাসদস্য ও একজন সাধারণ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর মধ্যকার পার্থক্য প্রায় ঘুচে গেছে। ব্যবধান কেবল এতটুকু যে একজনের গায়ে থাকে সামরিক পোশাক আর সে একটি কাঠামোর অধীনে কাজ করে; অন্যজন জিনস প্যান্ট পরে ঘোরে এবং খেয়ালখুশিমতো গুলি চালাতে পারে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গ্রাম ও শহরে হামলা চালিয়ে, অবকাঠামো ধ্বংস করে, ফিলিস্তিনিদের আটক, নির্যাতন এমনকি হত্যা করে তাদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে। এরপর সেখানে বাড়ে বসতি স্থাপনকারীদের অনুপ্রবেশ। আর সবশেষে সরকারের প্রশাসনিক হাত সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে দখল স্থায়ী করে। জেনিনে ঠিক এটিই ঘটেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেখানে একের পর এক প্রাণঘাতী অভিযান চালিয়েছে, যার সর্বশেষটি ছিল ২০২৫ সালের ‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’। এর পরপরই আগমন ঘটে বসতি স্থাপনকারীদের। আজ সেই শহরের কাছেই তিনটি নতুন ইসরায়েলি বসতি গড়ে উঠছে, আর তুলকারেমে আরও কয়েকটির কাজ চলছে।
ইসরায়েল সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী কেবল যে বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দেয় তা-ই নয়, বছরের পর বছর ধরে যেসব ইসরায়েলি সেনা ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে যুক্ত ছিল, বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোর লবিং ও সমর্থনের কারণে তারা বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে। এই তাণ্ডবকে কেবল ‘বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হলে পুরো সত্যটা আড়ালেই থেকে যায়। এই পরিভাষাটি শুনলে মনে হয় এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা, যা একটি অবৈধভাবে দখল করা জমিতে সুপরিকল্পিতভাবে চালিয়ে যাওয়া উপনিবেশায়নের মূল কৌশলকে ঢেকে দেয়।
ফিলিস্তিনিরা বছরের পর বছর ধরে বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংসতার বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। গত এক দশকের প্রতিটি বছরই বসতি সম্প্রসারণ, জমি দখল, ইসরায়েলি সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর নতুন রেকর্ড গড়েছে। প্রতিবছর জলপাই সংগ্রহের সময় বাধা দেওয়া কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় ফাঁড়িগুলোর বিস্তারকে ফিলিস্তিনিরা তাদের ওপর ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসা আগ্রাসন হিসেবেই দেখেছে। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, গণহত্যামূলক সামরিক অভিযান, পুরো সম্প্রদায়ের জন্য অবৈধ উচ্ছেদ আদেশ, গণগ্রেপ্তার—সবই একই কৌশলগত উদ্দেশ্যে পরিচালিত: ভূখণ্ড দখল।
আজ সেই আগ্রাসনের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে। ফিলিস্তিনিরা এখন এক স্থায়ী ঔপনিবেশিক সন্ত্রাসের মধ্যে অবরুদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের এমন এক পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, যেখানে নারীরা চেকপয়েন্টে আটকে থেকে গর্ভপাতের শিকার হচ্ছেন, স্কুলে সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে, আর বসতি স্থাপনকারীরা বাসে হামলা চালানোয় শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। প্রতিদিন নিরাপদে বেঁচে থাকার জায়গাটুকু সংকুচিত হয়ে আসছে। গত সপ্তাহে তালের বাসিন্দা ফারুক রমাদান এক হামলাকারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাঁকে গুলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সপ্তাহান্তে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের এই নৃশংস প্রতিক্রিয়া কোনো ইসরায়েলি নিহত হওয়ার জন্য ছিল না; বরং একজন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে—এই চিন্তাটাই তাঁদের ভয়ের মূল কারণ।
বৃহস্পতিবার তালে যা ঘটেছে এবং আজ পুরো পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি কোনো নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি সরাসরি জমি দখলের একটি প্রকল্প। কৌশল ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ইসরায়েল গাজা, পশ্চিম তীর, জেরুজালেম এবং এমনকি সিরিয়া ও লেবাননেও একই ছকে মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। একসময় পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সীমানা বিস্তারকে বিশ্বের জন্য একটি সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হতো। আজ তা ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে এক চরম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। অথচ বিশ্ব আজও এটিকে ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তা’ ইস্যু হিসেবেই দেখে যাচ্ছে।

