ভারতে গণমাধ্যমে আস্থার সংকট, ছাঁটাইয়ের মুখে বহু সাংবাদিক

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম ও টেলিভিশন সংবাদ মাধ্যমগুলো এক নজিরবিহীন আস্থার সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একসময়ের খবরের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত এই মাধ্যমগুলো আজ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে। পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি নির্লজ্জ আনুগত্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ এদের 'গোদি মিডিয়া' হিসেবে অভিহিত করছে। এর ফলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দর্শকসংখ্যা ও টিআরপি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সংবাদকর্মীদের ওপর এবং শুরু হয়েছে ব্যাপক ছাঁটাই।

সংবাদমাধ্যমগুলো এখন আর কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং করপোরেট স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষ ইউটিউব চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে স্বাধীন সাংবাদিকরা তুলনামূলক নিরপেক্ষতা ও সাহসের সাথে খবর প্রকাশ করছেন। করপোরেট মালিকরা কেবল মুনাফার হিসাব বোঝেন, আর বিজ্ঞাপনের আয় কমলেই তার দায়ভার পড়ে সাধারণ সাংবাদিকদের ওপর।

লেখক ও সাংবাদিক গৌতম বসুমল্লিক জানিয়েছেন যে, করপোরেট মালিকের সিদ্ধান্তে কর্মীরা হঠাৎ করেই চাকরি হারানোর খবর পান। এই গণহারে ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিবাদ বা আন্দোলনও দেখা যায় না, যা সাংবাদিকদের অসহায়ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। কলকাতার একটি প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ‘নিউজ ১৮ বাংলা’-তে সম্প্রতি ২৮ জন কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। রিপোর্টিং, ডেস্ক, ক্যামেরা, গ্রাফিক্স ও ডিজিটাল বিভাগের এই কর্মীরা মধ্যম সারির বেতনভুক ছিলেন, যাদের বেতন ছিল ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। অথচ আর্থিক পুনর্গঠনের অজুহাতে তাদের ছাঁটাই করে টিভি নাইন থেকে বিপুল বেতনে নতুন অ্যাঙ্কর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

চ্যানেলগুলোর সম্পাদকীয় নীতিতেও রাতারাতি পরিবর্তন আসছে। কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা ইস্তফা দিলে দিল্লি থেকে আসা নতুন প্রধান চ্যানেলের রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। একই উপস্থাপক ভিন্ন ভিন্ন দলের পক্ষে কথা বলায় দর্শকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং চ্যানেলগুলো তাদের নিজস্ব দর্শক হারিয়ে টিআরপি তলানিতে ঠেকছে। এটি কেবল একটি চ্যানেলের নয়, বরং সমগ্র মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থার চিত্র। সাংবাদিকতা এখন আর প্যাশন বা দায়িত্ববোধের জায়গা নয়, বরং করপোরেট ও রাজনৈতিক স্বার্থের জাঁতাকলে পিষ্ট একটি পেশা। মূলধারার গণমাধ্যম যদি দ্রুত নিরপেক্ষতা ও কনটেন্টের মান উন্নত না করে, তবে আগামী দিনে টেলিভিশন সাংবাদিকতার অস্তিত্ব আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোই খবরের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।