বিদেশে নারী কর্মী যাওয়া বাড়লেও গন্তব্য মূলত দুই দেশনির্ভর

বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও তা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বাইরে যাওয়া নারী কর্মীদের ৯০ শতাংশের বেশি গেছেন কেবল সৌদি আরব ও জর্ডানে। গৃহকর্মের বাইরে নতুন কোনো কাজের ক্ষেত্র বা বিকল্প গন্তব্য তৈরি না হওয়ায় এই খাতটি এখনো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রয়ে গেছে। অন্যদিকে, বিদেশ থেকে ফিরে আসা নারী কর্মীদের বড় একটি অংশ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ করছেন, যার ফলে নারীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহও কমছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গিয়েছিলেন। তবে ২০২৫ সালে এই সংখ্যাটি নেমে আসে ৬২ হাজার ৩১৭ জনে, যা তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪১ শতাংশ কম। অবশ্য চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নারী কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ১৪ শতাংশ বা ৫ হাজার ২১৪ জন বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে মোট ৪৮টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী কাজের জন্য গেছেন।

অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গৃহকর্মের বাইরে দক্ষ নারী কর্মীদের জন্য নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশে যাওয়া নারী কর্মীদের বড় অংশেরই ভাষা ও রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালি কাজের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকে না। অন্যদিকে নিয়োগকর্তারা তাদের একাধিক বাড়িতে কাজ করানোসহ দীর্ঘ সময় খাটানো, নিয়মিত খাবার ও বেতন না দেওয়া এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবও এখন আফ্রিকার দেশগুলো থেকে বিকল্প কর্মী নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এভাবে নারী কর্মী পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা মানিকগঞ্জের অঞ্জনার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ২০১২ সাল থেকে লেবানন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে কাজ করা অঞ্জনা গত ২০ মার্চ সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন। সেখানে তিনি মাত্র ১ মাস ৩ দিন ছিলেন, যার মধ্যে কাজ করেছেন মাত্র ৫ দিন। বাকি সময় রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে। পরে দেশ থেকে টাকা আনিয়ে টিকিট কেটে খালি হাতে ফিরেছেন তিনি। অঞ্জনার অভিযোগ, রিকুটিং এজেন্সিগুলো কেবল কর্মী পাঠাতে পারলেই টাকা পায়, তাই কাজ নিশ্চিত না করেই তারা নারীদের বিদেশে পাঠিয়ে দেয়।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নরসিংদীর সানজীদা আখতার। এক বছর আগে সৌদি আরব থেকে ফেরা সানজীদা সেখানে ২ মাস ২৫ দিন ছিলেন। যে বাসায় কাজ করতেন, সেখানে নিয়োগকর্তা তাকে নিজের বাসার পাশাপাশি তার মা ও শ্বশুরবাড়িতেও কাজ করাতেন। খেতে দেওয়া হতো শুধু রুটি। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে এজেন্সির কার্যালয়ে ফেরত পাঠানো হলে সেখানেও শুরু হয় নিপীড়ন। শেষ পর্যন্ত নিজের টাকায় টিকিট কেটে শূন্য হাতে দেশে ফেরেন তিনি এবং আর কখনো বিদেশে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পরের দুই বছর বাড়লেও ২০২৩ (2023) সালে তা আবার কমে আসে। ফিরে আসা কর্মীদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, রামরু, ওকাপ ও বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের মতো সংগঠন। এসব সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, ফিরে আসা নারীদের অনেকেই গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফেরেন। মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে নেওয়া, দৈনিক ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো, নিয়মিত খাবার ও বেতন না দেওয়া এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের মতো অভিযোগ প্রতিনিয়ত আসছে। এমনকি নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে এবং অনেকে পালিয়ে গিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়ে দেশে ফিরছেন।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম জানান, নারীদের এক কাজের কথা বলে নিয়ে একাধিক কাজ করানো হচ্ছে এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগও অনেক। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নারীদের বিদেশে না পাঠানোই শ্রেয় বলে মনে করেন তিনি। অন্যদিকে, ওকাপের চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বলেন, নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসার পর নারীরা কোনো বিচার পান না। এই বাস্তবতায় অন্য নারীরাও সচেতন হচ্ছেন, যার ফলে বিদেশে যাওয়ার প্রতি তাদের অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ওকাপের কাজ থেকে জানা যায়, আগে সেখানে প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে নারী কর্মীরা বিদেশে যেতেন। কিন্তু নির্যাতনের নানা ঘটনার পর এখন আর নারীরা যেতে চাচ্ছেন না, বরং তাদের পরিবর্তে পুরুষেরা যাচ্ছেন। ওকাপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশই প্রবাসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির এবং ৮২ শতাংশ ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ কর্মঘণ্টার শিকার হয়েছেন। ব্র্যাকের তথ্যমতে, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনে কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখলেও বাংলাদেশ এখনো সেই কঠোর অবস্থানে যেতে পারেনি।

এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নারীদের ভীতি কমাতে ইতোমধ্যে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা চালু করা হয়েছে এবং সৌদিতে ‘সেফ হোম’ কার্যকর রয়েছে, যার ফলে নির্যাতন কিছুটা কমেছে। তবে সরকার এখন মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি জাপান ও হংকংয়ের মতো দক্ষ শ্রমবাজারে নজর দিচ্ছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কেয়ারগিভার ও হাউসকিপিংয়ের মতো কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আর কখনো বিদেশে যেতে চান না তিনি।২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এক লাখের বেশি হারে নারী কর্মী বিদেশে গেছেন প্রতিবছর।

২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এই সংখ্যা কমে আসে।